Saturday, 1 May 2021

স্মৃতিতে সত্যজিৎ

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় নন্দনে৷ সে বছর তিরিশেক আগের কথা৷ খালি এটুকু মনে আছে যে হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে দেখলাম একটা বড় অন্ধকার ঘরে বসে আছি আর সামনের পর্দায় কিছু একটা হচ্ছে! আসলে সে দিন বাবা মা দাদার সঙ্গে ঘুরতে গেছিলাম৷ চিড়িয়াখানা, যাদুঘর, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখে নন্দনে যখন "হীরক রাজার দেশে"র স্পেশাল শো তে গিয়ে বসলাম তখন আর জেগে থাকতে পারিনি৷ ঘুম ভেঙেছিল একদম দড়ি ধরে মারো টান এর পরে৷ বলাবাহুল্য সেদিনের ঘোরাঘুরির কিছুই আমার মনে নেই৷ সবটাই পরে শোনা৷ কিন্তু ঐ অন্ধকার হলের মধ্যে ঘুম ভেঙে ওঠাটা দিব্যি মনে আছে৷

স্মৃতি ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে৷ "যখন ছোট ছিলাম" এ সত্যজিৎ লিখেছেনঃ "পাঁচ বছর বয়সে আমি চিরকালের মতো আমার জন্মস্থান গড়পার রোডের বাড়ি ছেড়ে ভবানীপুরে চলে আসি৷ এই পুরনো বাড়ি থেকে নতুন বাড়ি চলে আসার দিনটা আমি বেমালুম ভুলে গেছি, কিন্তু গড়পারে থাকতে আমাদের রাঁধুনী বামনীর ছেলে হরেনের বিষয় একটা খুব সাধারণ স্বপ্ন দেখেছিলাম সেটা আজও স্পষ্ট মনে আছে৷" স্মৃতির রহস্য এতটাই গভীর যে সে রহস্য ভেদ করার জন্য প্রোফেসর শঙ্কুর ওপরও ভরসা করতে পারেননি তাঁর স্রষ্টা৷ কয়েক মিনিটে হারানো স্মৃতি ফেরানোর যন্ত্র "রিমেমব্রেন" আবিষ্কার করেও প্রোফেসর শঙ্কু তাঁর ডায়েরি তে লিখতে বাধ্য হন, "স্মৃতির গূঢ় রহস্যটা এখনও বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে৷"

কাশবনের মধ্য দিয়ে অপু দুর্গার রেলগাড়ি দেখতে যাওয়া, তুফান এক্সপ্রেসের কামরায় জটায়ুর আবির্ভাব, বাঁশবনে গুপি-বাঘার সঙ্গে ভূতের রাজার মোলাকাৎ এই সব দৃশ্যগুলোই অন্য সবার মত আমার কাছেও ভীষণ প্রিয়৷ বহুবার দেখার পরও টিভিতে দেখানো হলে চোখটা আটকে যাবেই৷ তেমনই পঞ্চাশবার পড়ার পরেও পুরনো হয়না ফেলুদা বা শঙ্কুর  অ্যাডভেঞ্চার৷ কিন্তু অদ্ভুতভাবে "সত্যজিৎ রায়" নামটা শুনলে আমার মাথায় প্রথমেই আসে একদমই ভিন্ন তিনটি চরিত্রের কথা৷ আজ সেই তিনজনের কথা বলব৷

প্রথমজন হলেন পটলবাবু৷ ছোটবেলা থেকেই যাত্রা, থিয়েটারের নেশা৷ যুদ্ধের বাজারে চাকরি খুইয়ে পেটের ধান্দায় নেমে পড়ে সেই নেশায় ইতি৷ হঠাৎ বাহান্ন বছর বয়সে একটা সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পেলেন, যখন তিনি লোহালক্করের দোকানে ঘোরাঘুরি করছেন একটা কাজের আশায়৷ স্বভাবতই প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পটলবাবু শুটিং এর জায়গায় পৌঁছে জানতে পারলেন তাঁর ভূমিকা একজন পথচারীর৷ ব্যস্তসমস্ত নায়কের সঙ্গে ধাক্কা লাগবে আর তিনি বিরক্তিতে "আঃ" বলে বেরিয়ে যাবেন৷ প্রথমে হতাশ হয়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবলেও তারপর তাঁর নাট্যগুরু গগন পাকড়াশির উপদেশ মাথায় এলো৷ তিনি উপলব্ধি করলেন ঐ ছোট্ট দৃশ্য আর সংলাপটার মধ্যেও কতরকম সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে৷

"আঃ কথাটাই নানান সুরে নানাভাবে বললে মানুষের মনের নানান অবস্থা প্রকাশ করছে৷ চিমটি খেলে মানুষে যেভাবে আঃ বলে, গরমে ঠাণ্ডা খেয়ে মোটেই সেভাবে আঃ বলে না৷ এ দুটো আঃ একেবারে আলাদা রকমের; আবার আচমকা কানে সুড়সুড়ি খেলে বেরোয় আরো আরেক রকম আঃ৷ এছাড়া কতরকম আঃ রয়েছে - দীর্ঘশ্বাসের আঃ, তাচ্ছিল্যের আঃ, অভিমানের আঃ, ছোট করে বলা আঃ, লম্বা করে বলা আ—ঃ, চেঁচিয়ে বলা আঃ, মৃদুস্বরে আঃ, চড়া গলায় আঃ, খাদে গলায় আঃ, আবার আ-টা খাদে শুরু করে বিসর্গটায় সুর চড়িয়ে আঃ— আশ্চর্য! পটলবাবুর মনে হল তিনি ওই একটি কথা নিয়ে একটা আস্ত অভিধান লিখে ফেলতে পারেন৷"

পটলবাবু নিজেই আধঘন্টা একটা নির্জন গলিতে রিহার্সাল দিলেন৷ তারপর ক্যামেরার সামনে নিজের আবেগ, নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের ফসল দশ আনা বিরক্তির সঙ্গে তিন আনা বিস্ময় আর তিন আনা যন্ত্রণা মিশিয়ে আঃ উচ্চারণ করে পরিচালককে খুশি করে দিলেন৷ কিন্তু ফিল্মের লোকজন সম্মানদক্ষিণা দিতে গিয়ে পটলবাবু কে আর খুঁজে পেল না৷ পটলবাবুর শিল্পীমনের কদর ফিল্মের দল করতে পারবে বলে তাঁর মনে হয়নি৷

  

দ্বিতীয় যে চরিত্রটার কথা বলব সে হল ব্রাউনি৷ ব্রাউনি মানুষ নয়, কুকুর৷ ব্রাউনিকে যিনি হাসিমারার রাস্তায় এক ভূটানির থেকে কিনেছিলেন সেই অসমঞ্জবাবুর চরিত্রটা অবশ্য সত্যজিতের গল্পে বিরল নয়৷ অসমঞ্জবাবুর মত সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত একা মানুষরা ঘুরে ফিরে এসেছে তাঁর লেখায়৷ ফেলুদা, শঙ্কু, তারিনীখুড়োও এই দলে পড়েন৷ তিনজনের কেউই বিয়ে করেন নি৷ লালমোহনবাবুর সঙ্গে আলাপ না হলে ফেলুদার কোন বন্ধু কে খুঁজেই পাওয়া যেত না৷ দেশে দেশে বিবিধ সম্মানে ভূষিত হয়ে প্রোফেসর শঙ্কুর নিশ্চিন্তির ঠিকানা গিরিডিতে উশ্রী নদীর ধারের বাড়িটা, প্রহ্লাদ, নিউটন৷ তারিনীখুড়ো যৌবনে দেশের নানা প্রান্তে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে বাকি জীবনটা কলকাতার কিছু বাচ্ছা ছেলেকে গল্প বলেই কাটিয়ে দেন৷ ব্রাউনির বিশেষত্ব হল সে হাসে৷ হাসি মানে হায়েনার হাসি নয়৷ হাসির কারণ ঘটলে তবেই হাসে৷ সে কারণ ঝড়ের মধ্যে মারোয়ারি ব্যবসায়ীর ছাতা উল্টে যাওয়া হতে পারে, সাংবাদিকের তোতলামো হতে পারে বা অসমঞ্জবাবুর চেয়ার ভেঙে পড়ে যাওয়াও হতে পারে৷ কারণ না থাকলে হাসে পাগলে। ব্রাউনি পাগল নয়। তাই কুকুর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক থেকে পশুচিকিৎসক কারো কাছেই ব্রাউনির হাসির প্রমাণ দেখাতে পারেন না অসমঞ্জবাবু, আর তাঁরা একবাক্যে রায় দিয়ে দেন যে “কুকুর হাসতে পারে না।” এখন টিভি তে নানারকম “রিয়েলিটি শো” হয়, যেখানে দেখা যায় একজন মানুষ স্টেজে দাঁড়িয়ে একটা করে কথা বলছে আর অনুষ্ঠানের সঞ্চালক থেকে শুরু করে বিচারকমণ্ডলী হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। পাছে তাতেও দর্শকের হাসি না পায় তাই ব্যাকগ্রাউন্ডে অদৃশ্য দর্শকের হাসির আওয়াজ শোনানো হয়। ব্রাউনী কে এরকম কোন প্রোগ্রামের সামনে বসিয়ে দিলে সে-ও হয়ত হেসে ফেলত, টিভিওয়ালাদের জোর করে হাসানোর প্রচেষ্টা দেখে।

শেষে এক মার্কিন ধনকুবের হাজির হয়ে নানারকম অঙ্গভঙ্গী করে হাসানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। সে বলে যে অসমঞ্জবাবু যদি তার কুকুরকে হাসিয়ে দেখাতে পারেন তাহলে সে ব্রাউনির জন্য বিশ হাজার ডলার অবধি খরচ করতে রাজি। আর তখনই অট্টহাস্য করে ওঠে ব্রাউনী। সে হাসির অর্থ অসমঞ্জবাবু ছাড়া কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না। কুবের মহাশয় পকেট থেকে চেকবই বের করে নাম লিখতে যাবে, তখন অসমঞ্জবাবু খোলসা করলেন ব্রাউনীর হাসির কারণ- সাহেব ভাবছে টাকা থাকলেই সবকিছু কেনা যায়! সাহেবের সঙ্গে যে বাঙালী ট্যুরিস্ট ম্যানেজার এসেছিল, সে ব্যঙ্গের স্বরে প্রশ্ন করে, “আপনার কুকুর বুঝি দার্শনিক?” এই জীবনদর্শনও আসলে যে আসলে স্রষ্টা সত্যজিতের তা বুঝতে অসুবিধা হয় না৷ সেক্রেটারি পরশ পাথর গিলে ফেলার পর পরেশ বাবুকে দেখা যায় গিন্নী আর চাকরকে নিয়ে নিশ্চিন্তে হাওয়া খেতে। হাল্লার কারাগারে বন্দী গুপি বাঘা গান গেয়ে রাজা কে পরামর্শ দেয়, সোনার সিংহাসন ত্যাগ করে মাঠে নেমে হাওয়া খেতে। নায়ক অরিন্দম কে দেখি টাকার চোরাবালিতে ডুবে গিয়ে বাঁচার জন্যে কাতর আর্তনাদ করতে।



তৃতীয় জনের নাম জানি না৷ পেশায় হাল্লার গুপ্তচর৷ গুপি গাইন বাঘা বাইন ছবিতে বার দুয়েক তাকে হাল্লার মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে৷ হাল্লার মন্ত্রী চরিত্রটা আমাদের ভীষণ চেনা৷ সে আগে ডাকাত ছিল, এখন মন্ত্রী হয়েছে৷ প্রজাদের না খাইয়ে রেখে নিজে গাণ্ডেপিণ্ডে গেলে৷ যেনতেন প্রকারেণ প্রজাদের অত্যাচার করা আর যুদ্ধ করে অন্য রাজ্য দখল করাতেই তার আনন্দ৷ প্রজাদের ওপর অত্যাচার করার নেশা তার এতই বেশী যে মহামারীতে মূক হয়ে যাওয়া শুণ্ডির প্রজাদের মুখে সে কথা ফিরিয়ে দিতে চায় শুধু এই উদ্দেশ্যে যে কথা না বললে তারা কি চায় জানা যাবে না, তার উল্টো কাজটাও করা যাবে না! যাদের মাধ্যমে সে অত্যাচার করে সেই সৈনিক, কারারক্ষী, গুপ্তচর - এদেরকেও সে না খাইয়ে রাখে৷ তো গুপ্তচর যখন শুণ্ডিতে যায় চরবৃত্তি করতে তার নিজের রাজ্যের অবস্থাটাও নিশ্চয়ই মাথায় থাকে৷ হাল্লার মন্ত্রী জিজ্ঞেস করে, "শুণ্ডিতে যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম কিরম দেখলে?” গুপ্তচর জানায়, “কিচ্ছু নেই। অস্ত্র-শস্ত্র নেই, সৈন্য নেই।” মন্ত্রী অবাক হয়ে বলে, “লোকেরা করে কি? ওরা কি ঘোড়ার ঘাস কাটে?” গুপ্তচর বলে, শুণ্ডিতে ঘোড়া নেই, হাতি নেই, উটও নেই। মন্ত্রী হাসতে হাসতে সিংহাসন থেকে উঠে পড়ে, “হাঃ হাঃ হাঃ! উটও নেই? বাঃ বাঃ! চমৎকার! যুদ্ধের কোন ব্যবস্থাই নেই! … তাহলে আছে টা কি শুনি?” গুপ্তচর তৃপ্তির হাসি হেসে বলে, “ক্ষেতে ফসল আছে। গাছে ফল আছে, ফুল আছে, পাখি আছে …” মন্ত্রীর তাচ্ছিল্যের “হুঁঃ” কে পাত্তা না দিয়ে সে বলে চলে, “দেশে শান্তি আছে, সুখ আছে, হাসি আছে..." সত্যজিৎ বলেছিলেন “গুপি গাইন বাঘা বাইন” নেহাতই একটা ছোটদের রূপকথা। রূপকথা তো বটেই। সেই দেশ “ভালো দেশ’ নয়, যেদেশে অস্ত্র-শস্ত্র, সেনাবাহিনীর সমারোহ করে প্রতিবেশীর সঙ্গে যুদ্ধজিগির তোলা হয়; সেই দেশই ভালো দেশ, যেখানে লোকে পেটভরে খেতে পায়, সুখে শান্তি তে থাকে - রাষ্ট্রের বেতনভুক গুপ্তচরের এই উপলব্ধি রূপকথা ছাড়া কোথায় হতে পারে?


তিনজনের কথাই বলব বলে বসেছিলাম৷ অথচ লিখতে লিখতে ভিড় করে এল আরো কত চরিত্র৷ মগনলালের প্রাইভেট সার্কাসে বন্দী প্রতিভাবান নাইফ থ্রোয়ার অর্জুন, "পণরক্ষা" আবৃত্তি করে মেডেল জেতা শশাঙ্ক সান্যাল, ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং এর বন্ধু বঙ্কুবাবু, কাঞ্চনজঙ্ঘার অশোক, যতদিন জান থাকবে ততদিন গান গাওয়ার অঙ্গীকার করা চরণদাস, মন্দিরের জলদূষণ নিয়ে আওয়াজ তুলে "গণশত্রু"র তকমা পাওয়া ডাঃ অশোক গুপ্ত৷ আর সবার শেষে সিধুজ্যাঠার সেই অমোঘ উপদেশঃ "মনের জানলাটাকে বন্ধ করে রেখো না ফেলু৷" আর রাজার আদেশে পাঠশালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে উদয়ন পণ্ডিতের সেই প্রত্যয়, "এতদিন ধরে যা শিখিয়েছি, তোমরা তা ভুলবে না তো?" আজ লালমোহনবাবু থাকলে বলতেন, "একশো বছর? ছোহ!"

Sunday, 4 April 2021

ভোট ভাবনা

২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই লেখাটা প্রকাশিত হয়েছিল চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবপত্রের ৫ই এপ্রিল ২০২১ সংখ্যায়। সম্পূর্ণ লেখাটি পড়ার লিঙ্কঃ

ভোট ভাবনা, অতনু কুমার, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম, ৫ই এপ্রিল ২০২১




Saturday, 13 March 2021

পাগলা জগাই

"পাগলা জগাই" গল্পটি জয়ঢাক বসন্ত ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পূর্ণ গল্পটি পড়ার লিঙ্কঃ

পাগলা জগাই, অতনু কুমার, জয়ঢাক, বসন্ত ২০২১






Thursday, 22 October 2020

বন্ধুত্বের ভাইরাস

 কল্পাণু গল্প "বন্ধুত্বের ভাইরাস", প্রকাশিত হয় শারদীয় কল্পবিশ্ব ২০২০ তে। সম্পূর্ণ গল্পের লিঙ্কঃ 

কল্পবিশ্ব পত্রিকা, শারদীয় ২০২০, কল্পাণু গল্প






Wednesday, 7 October 2020

ব্ল্যাক হোল আর নোবেলঃ অপেক্ষার অবসান

কৃষ্ণগহ্বর (black hole) শব্দটা সংবাদমাধ্যমের কল্যানে আমজনতার কাছে একেবারেই অপরিচিত নয়৷ একশো বছরেরও বেশী সময় ধরে জিনিসটার রহস্য বিজ্ঞানী, কল্পবিজ্ঞান লেখক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে রোমাঞ্চিত করেছে৷ কিন্তু নোবেল পুরস্কারের তালিকায় উঠতে কৃষ্ণগহ্বরের লেগে গেল ২০২০ সাল৷ এবারে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের অর্ধেক পাচ্ছেন রবার্ট পেনরোজ৷ তিনি দেখিয়েছেন, কৃষ্ণগহ্বর হল সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের অমোঘ ভবিষ্যৎবাণী৷ বাকি অর্ধেক ভাগ করে নিচ্ছেন রেনার্ড গেঞ্জেল এবং আন্দ্রে ঘেজ৷ তাঁরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রে একটি অতি ভারী ঘনবস্তু আবিষ্কার করেছেন৷ বলা বাহুল্য ঐ বস্তুটি কৃষ্ণগহ্বর ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না৷ 



ব্ল্যাকহোল নামটা তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও ব্ল্যাকহোলের মত কিছু একটা বস্তুর অস্তিত্ত্ব কল্পনা করা হয়েছিল উনবিংশ শতকের আটের দশকে৷ আমরা যদি একটা ঢিলকে ওপর দিকে ছুঁড়ি, সেটা এক সময় নীচে নেমে আসবে৷ যদি আরো জোরে ছুঁড়ি, সেটা আরো ওপরে উঠে আরো একটু দেরিতে মাটিতে পড়বে৷ কিন্তু এতটাও জোরে কি ছুঁড়তে পারি, যাতে করে ঢিলটা আর ফিরে আসবে না, পৃথিবীর অভিকর্ষের মায়া কাটিয়ে মহাশূণ্যে হারিয়ে যাবে? হ্যাঁ পারি, এবং সেই বেগকে বলা হয় মুক্তিবেগ৷ পৃথিবীপৃষ্ঠের ওপর মুক্তিবেগের মান ১১.২ কিমি/সেকেন্ড৷ তো এমন কোন নক্ষত্র যদি থেকে থাকে যার পৃষ্ঠের ওপর মুক্তিবেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশী, তাহলে তো সবকিছুই, এমনকি আলোও, আটকে পড়বে ঐ নক্ষত্রের টানে! যদিও সেই কল্পনাকে বাস্তব রূপ দেওয়া যায়নি৷ তারপর ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিককতার তত্ত্ব ( General Theory of Relativity) বাজারে আনলেন আর সঙ্গে সঙ্গেই সোয়ার্জচাইল্ড একটা নিখুঁত সুষম বৃত্তাকার বস্তুর জন্য আইনস্টাইন সমীকরণের খুব সুন্দর একটা সমাধান বের করে ফেললেন৷ সোয়ার্জচাইল্ডের সমাধানে একটা বিন্দু পাওয়া গেল যেখানে গিয়ে আর পদার্থবিজ্ঞানের কোন জানা নিয়ম কাজ করে না৷ ঐ বিন্দুই হল অনন্যতা (singularity)৷ দেখা গেল অনন্যতাকে ঘিরে ঘটনা দিগন্ত (event horizon) নামে এক বৃত্তাকার তল আছে, যেখান দিয়ে বাইরে থেকে ভেতরে জিনিসপত্র ঢুকবে, কিন্তু ভেতর থেকে কিছু বাইরে বেরোবে না৷ আলোও না৷ পরে আরো অনেক বিজ্ঞানী আইনস্টাইন সমীকরণের সমাধান বের করলেন৷ কেউ ধরলেন ঐ নিখুঁত বৃত্তাকার বস্তুটার ভরের সঙ্গে কিছু আধানও আছে, কেউবা আবার ধরলেন বস্তুটা একটা অক্ষের চারদিকে বনবন করে ঘুরছে৷ মোদ্দাকথা এটাই যে সমাধানগুলো কিছু বিশেষ প্রতিসাম্যের (symmetry) উপস্থিতি ধরে নিয়ে করা৷ তা না করলে অরৈখিক (non linear) আর অত্যন্ত জটিল আইনস্টাইন সমীকরণকে বাগ মানানো যেত না৷ কিন্তু ঘটনা হল ঐরকম নিখুঁত প্রতিসম বস্তু তৈরী হওয়া কার্যত অসম্ভব৷ যত দক্ষ কারিগরই হোক, যত ভালো যন্ত্রই থাকুক একদম নিখুঁত গোলক তৈরী করা আদৌ সম্ভব নয়৷ সৌরজগতে যে গ্রহগুলো আছে বা যেসব নক্ষত্রকে আমরা মোটামুটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি তারা কেউই নিখুঁত গোলক নয়, সুষম তো নয়ই৷ যাঁরা ভগবান টগবানে বিশ্বাস করেন, ইদানীং তাঁরাও বলেন যে ভগবানের কোন সৃষ্টিই আর যাই হোক, "পারফেক্ট" নয়৷ একদম নিখুঁত প্রতিসাম্য অতএব নেহাত দুর্ঘটনা ছাড়া ঘটা সম্ভব নয়৷ তাই যদি হয়, তো ব্ল্যাকহোল বলেও আসলে কিছু হয় না৷ সোয়ার্জচাইল্ড ও অন্যান্যদের নিখুঁত গোলকের কল্পনা থেকে অঙ্ক কষেই ঐরকম বিজাতীয় বস্তু পাওয়া যাচ্ছে৷ 

অন্তত ষাটের দশক অবধি বিজ্ঞানীরা এটাই মনে করতেন৷ তারপর রবার্ট পেনরোজ এবং স্টিফেন হকিং এর অনন্যতা উপপাদ্য (singularity theorem) তাঁদের নিশ্চিন্তির ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাল৷ (হকিং জীবিত থাকলে নিশ্চিতভাবেই নোবেল পুরস্কারে ভাগ বসাতে হাজির হয়ে যেতেন) পেনরোজ এবং হকিং দেখালেনঃ যদি মহাকর্ষই একমাত্র চালিকাশক্তি হয় আর আইনস্টানের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ মহাকর্ষের সঠিক ব্যাখ্যা হয় আর পদার্থের চরিত্র বিদঘুটে (যেমন বিকর্ষণধর্মী মহাকর্ষ) কিছু না হয় তাহলে অনন্যতা অবশ্যম্ভাবী৷ সংশ্লিষ্ট তারাটির গঠনে নিখুঁত প্রতিসাম্য থাকল কি না তাতে কিছু আসে যায় না৷ 

আকাশগঙ্গা ছায়াপথ

পেনরোজ, হকিং অঙ্ক কষে কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বকে নিশ্চিৎ করেছিলেন৷ কৃষ্ণগহ্বরের উপস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিলেন রেনার্ড গেঞ্জেল এবং আন্দ্রে ঘেজের নেতৃত্বে দুদল গবেষক৷ এখন আমরা কোন বস্তুকে দেখতে পাই কারণ সেই বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে আলো আমাদের চোখে আসে৷ দৃশ্যমান আলো না হলেও এক্স রে ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের হাড়ের ছবি বা ইনফ্রা রেড ক্যামেরায় অন্ধকারেও কোন প্রাণীর ছবি তোলা যায়৷ কিন্তু ব্ল্যাকহোল থেকে যেহেতু কোন বিকিরণই বাইরে আসে না, তাই তাকে সরাসরি দেখা সম্ভব নয়৷ কিন্তু ব্ল্যাকহোলের আশেপাশের বস্তুগুলোর গতিবিধি থেকে ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব জানা সম্ভব৷ বহুদিন আগেই ধনুরাশির মধ্যের একটি তারা Sagittarius A* থেকে তীব্র রেডিও সিগন্যাল পাওয়া গেছিল এবং সেই তারাটি যে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলে আছে তাও বোঝা গেছিল৷ আমাদের ছায়াপথটা একটা জিলিপির মত৷ যে জিলিপির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আলো পৌঁছতে এক লক্ষ বছর সময় লেগে যায়৷ গেঞ্জেল এবং ঘেজের নেতৃত্বে গবেষকরা দেখলেন ঐ জিলিপির একদম কেন্দ্রের আশেপাশের কিছু নক্ষত্র প্রচণ্ড গতিতে কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে৷ মেলা বা সার্কাসে একটা খেলা দেখেছিঃ একটা বৃত্তাকার ঘরের ভেতরের দেয়ালের মধ্যে কয়েকজন বাইক আরোহী প্রচণ্ড গতিতে ছোটাছুটি করছে, কিন্তু কেউ কারোকে ধাক্কা মারছে না৷ খেলাটার নাম ছিল মৃত্যুকূপ৷ ছায়াপথের কেন্দ্রের তারাগুলোর আচরণও ঐরকম৷ আর সূর্যের মত তারাগুলো কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে, জিলিপির প্যাঁচের ওপর বসে হেলেদুলে কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে৷ সার্কাসের তাঁবুর চারদিকে হেঁটে হেঁটে ঘোরার মত৷ S2 নামে একটা কেন্দ্রস্থলের একটা তারা মাত্র ১৬ বছরে ছায়াপথের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে৷ অন্যদিকে আমাদের সূর্য, যে কেন্দ্র থেকে যার দূরত্ব ছাব্বিশ হাজার আলোকবর্ষ, তার এক পাক ঘুরতে সময় লাগে ২০ কোটি বছর! ঐ সময়টাকে যদি একবছর বলি, তাহলে বলবঃ "এই তো গেল বছর টিরেনোসরাসটা ঐ পুকুরপারে ডিম পেড়ে গেল৷" এখন সৌরজগতের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি সূর্যের কাছের গ্রহগুলো যেমন বুধ, শুক্র এরা পাক খায় খুব তাড়াতাড়ি৷ আবার যত সৌরজগতের বাইরের দিকে যাওয়া যায় তত প্রদক্ষিণকাল বাড়তে থাকে৷ বুধের এক বছর হয় ৮৮ দিনে, বামন গ্রহ প্লুটোর ৯০ হাজার দিনে৷ এর কারণ সৌরজগতের প্রায় পুরো ভরটাই কেন্দ্রে সূর্যের মধ্যে জমা হয়ে আছে৷ যে গ্রহ সূর্যের যত কাছে, তার ওপর সূর্যের টান তত বেশী আর তার প্রদক্ষিণের গতিও তত বেশী৷ ছায়াপথের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার৷ নক্ষত্রগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বোঝা গেল আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঠিক কেন্দ্রে সূর্যের ভরের চল্লিশ লক্ষগুণ ভারী কোন অদৃশ্য বস্তু অর্থাৎ ব্ল্যাক হোল রয়েছে৷ এত ভারী ব্ল্যাক হোলের সৃষ্টি কিভাবে হল সে ব্যাপারে অবশ্য বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিৎ নন৷

ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপে তোলা ব্ল্যাকহোলের ছবি

একটা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক৷ পেনরোজের অনন্যতা উপপাদ্য তো সেই ষাটের দশকের ব্যাপার৷ আর রেনার্ড গেঞ্জেল, আন্দ্রে ঘেজদের পর্যবেক্ষণ নব্বইএর দশকের৷ তাহলে নোবেল পুরস্কার আসতে এত দেরি হল কেন? আসলে কোন প্রত্যক্ষ পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র তাত্ত্বিক গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় না৷ বছরখানেক আগে সাড়ে পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরের M87 ছায়াপথের কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তুলেছে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ৷ ২০১৫ তে দুই কৃষ্ণগহ্বরেরর সংঘর্ষের খবরও মিলেছে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের হাত ধরে৷ কৃষ্ণগহ্বর এখন আর তত্ত্ব আর অঙ্কের বিষয় নয়, ঘোর বাস্তব৷

২০১১ সালে মহাবিশ্বের ক্রমবর্ধমান প্রসারণের হার (Accelerated Exapasion of the Universe), ২০১৭ তে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Gravitational Waves), ২০১৯ এ বিশ্বতত্ত্ব ( Cosmology) ও বহির্গ্রহ (Exoplanet) আর ২০২০ তে কৃষ্ণগহ্বর - একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের প্রায় অর্ধেক এল আছে মহাকাশ থেকে৷ এমন কি ২০১৩ তে হিগস বোসনের (Higgs Boson) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে মহাবিশ্বের রহস্য সমাধানে৷ শেষ করার আগে একজন মানুষের কথা বলে যাই৷ পঞ্চাশের দশকে কলকাতার Indian Association for the Cultivation of Science এর এক গবেষক, প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বসে একটা পেপার লিখলেন৷ সেই পেপারের উপপাদ্য একটা সমীকরণ, যা এখন জেনারেল রিলেটিভিটির যেকোন টেক্সটবই য়ে অবশ্যপাঠ্য৷ গবেষকটির নাম অমলকুমার রায়চৌধুরী, একেআর নামেই যিনি সমধিক পরিচিত৷ রায়চৌধুরী সমীকরণের ওপর ভিত্তি করেই হকিং ও পেনরোজ তাঁদের অনন্যতা উপপাদ্যে উপনীত হন৷ 

সত্যেন দত্ত থাকলে হয়ত লিখতেনঃ
"অন্ধকূপের আগল ভাঙিল বাঙালীর উপপাদে,
বিধাতার কাজ সাধিবে বাঙালী ধাতার আশীর্বাদে৷"
অমলকুমার রায়চৌধুরী


 

Thursday, 17 September 2020

এগারোর গেরো

দুদিন বাদেই মহালয়া৷ মহালয়ার শাস্ত্রীয় তাৎপর্য যাই হোক, বাঙালীর কাছে মহালয়া মানে ভোর চারটেয় উঠে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর মহিষাসুরমর্দিনী শোনা আর হিসেব কষে দেখে নেওয়া, ঠিক সাতদিন বাদেই পুজোর ঢাকে কাঠি পড়বে। এবারের পুজো নানা কারণেই স্বতন্ত্র৷ একে তো করোনার কামড়ে পুজোর পনেরো আনাই মাটি। তাছাড়া আরেকটা ব্যাপারও রয়েছে। এবার আর সাতদিন নয়, মহালয়ার পাক্কা ৩৫ দিন পর আসছে দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী৷ ভদ্রমশাই বেঁচে থাকলে হয়ত বাণীকুমারের লেখাটা একটু পালটে নিয়ে বলতেনঃ "কার্তিকের হেমন্তপ্রাতে সেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির ..."। এই সৃষ্টিছাড়া কাণ্ডের গোড়াটা খুঁজতে গিয়ে বিগত বছরগুলোর মহালয়া আর পুজোর দিনক্ষণ তল্লাশ করতে বসলাম। পুরনো ক্যালেন্ডারগুলোর ধূলো ঝেড়ে, কিছু আবার বইয়ের মলাট থেকে খুলে নিয়ে শেষ পাঁচ বছরের তারিখগুলো দাঁড়ালো এইরকমঃ 



মহালয়া আর ষষ্ঠী দুটোই প্রতি বছর ১১ দিন করে এগিয়ে আসছে৷ আর এক বা দু বছর অন্তর লাফ দিয়ে ১৮ বা ১৯ দিন পিছিয়ে যাচ্ছে৷ ২০১৭ সালে মহালয়া আর ষষ্ঠী, দুটোই ১১ দিন এগিয়েছে৷ আবার ২০১৮ সালে দুটোই ১৯ দিন পিছিয়েছে৷ বেশীরভাগ সময় দুটো একইরকমভাবে এগোয় বা পেছোয় বলে ঐ সাতদিনের গ্যাপটা বজায় থাকে৷ যদিও ২০১৯ এ গ্যাপটা দাঁড়িয়েছিল ৬ দিনে৷ কিন্তু এই বছর তাদের গাঁটছড়া ভেঙেছে। মহালয়া এগারো দিন এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ষষ্ঠী ১৮ দিন পিছিয়ে গেছে৷ তাহলে মহালয়া আর ষষ্ঠীর ব্যবধান দাঁড়ালো ১১+১৮+৬=৩৫৷ অঙ্ক নাহয় মিলল, কিন্তু আঠেরো আর এগারোর গেরোটা ছাড়ানো যায় কিভাবে? হিন্দুধর্মের অন্যান্য উৎসবগুলোর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখছি সেখানেও ঐ এগারো আর আঠেরোয় চু কিৎ কিৎ খেলা চলছে৷ শুধু হিন্দুধর্ম নয়, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের ক্ষেত্রেও এই একই ব্যাপার দেখা যাবে৷ উদাহরণ হিসেবে জন্মাষ্টমী আর বুদ্ধপুর্ণিমার তারিখগুলোয় চোখ বুলানো যাকঃ



খেয়াল করার বিষয়, যে এগারো দিনের পিছানোর কথা বলেছিলাম সেটা কখনও দশ বা বারো দিন হচ্ছে৷ আবার ঐ এক বা দু বছর অন্তর লাফটাও আঠারো বা উনিশের জায়গায় কখনও সখনও কুড়ি দিনের হচ্ছে৷ এক দু দিনের আগুপিছু নিয়ে পরে ভাবা যাবে৷ আপাতত এগারো আর আঠারো নিয়ে পড়া যাক৷ আচ্ছা একটা কথা বোধহয় বললাম। হিন্দুধর্মের সব উৎসবেই ঐ এগারো-আঠেরোর গেরো আছে এই কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। এইবছরই তো মহালয়া শুনেই ছাতে লাটাই নিয়ে ছোটার দিন। বিশ্বকর্মা পুজো হিন্দুধর্মের সেই বিরল উত্সবগুলোর মধ্যে একটা, যার তারিখ নির্দিষ্টঃ ১৭ই সেপ্টেম্বর৷ তবে ঐ বলে না " এক্সেপশন প্রুভস দ্য ল এটসেট্রা এটসেট্রা ... হিন্দুধর্ম ছেড়ে এবার যদি একটু ইসলাম ধর্মের তাকাই, তাহলে দেখব ইসলাম ধর্মের পরবগুলোর তারিখও প্রতি বছর ১১ বা ১২ দিন করে এগিয়ে আসছে৷ কিন্তু হিন্দুধর্মের মত ১৮/১৯ দিন পেছানোর ব্যাপারটা নেই৷ ঈদ-উল-ফিতর আর আশুরা বা মহরমের তারিখগুলো দেখে নেওয়া যাকঃ


যেকোন ক্যালেন্ডারেই সময়ের তিনটে একক থাকেঃ দিন, মাস ও বছর৷ এর মধ্যে "দিন" নিয়ে বিতর্ক নেই৷ সূর্য যতক্ষণ পর পর ঠিক মাথার ওপর আসে, সেই সময়ের ব্যবধানটাই হল এক সৌরদিন৷ এক সৌরদিনের দৈর্ঘ্য সমান থাকে না৷ কিন্তু ছয় ঋতুর গড় নিয়ে আমরা গড় সৌরদিন হিসাব করতে পারি। এই গড় সৌরদিনকে ২৪ দিয়ে ভাগ করে ঘন্টা, তারপর সেখান থেকে মিনিট, সেকেন্ড ইত্যাদি পাওয়া যায়৷ নক্ষত্রদিন অর্থাৎ পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারদিকে পূর্ণ আবর্তন করতে আসলে যে সময় লাগে তার মাপ ২৪ ঘন্টার চেয়ে মিনিট চারেক কম৷ তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নক্ষত্রদিনের ভূমিকা নেই বলে ওটা নিয়ে আপাতত মাথা ঘামাচ্ছি না৷ এরপর এল মাস৷ দুটো পূর্ণিমা কিংবা দুটো অমাবস্যার মধ্যের গড় ব্যবধান ২৯.৫ দিন৷ আসলে যদিও চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে পাক খেতে ২৭ দিন সময় নেয়, কিন্তু ঐ সময়ের মধ্যে পৃথিবী আবার নিজের কক্ষপথ বরাবর খানিক এগিয়ে যায়। তাই পরের পূর্ণিমা আসতে আরো আড়াই দিন লেগে যায়৷ তাহলে এক চান্দ্রমাসের দৈর্ঘ্য দাঁড়াল ২৯.৫ দিন৷ ভগ্নাংশ নিয়ে কাজ করা অসুবিধে বলে একমাস ২৯ দিন তো  পরের মাস ৩০ দিন এইভাবে ধরা হয়৷ এভাবে যদি বারোটা মাস পার করা যায় তাহলে আবার আগের আবহাওয়া ফিরে আসে৷ সুতরাং বারোটা চান্দ্রমাস বা এক চান্দ্রবছরের মাপ হল গিয়ে ১২X২৯.৫=৩৫৪ দিন৷ এইভাবে যে ক্যালেন্ডার তৈরী হল তাকে আমরা বলি চান্দ্র ক্যালেন্ডার (lunar calendar)৷

কিন্তু এই চান্দ্রবছর ক্রান্তীয় বছর নয়৷ ঋতুচক্র সম্পূর্ণ হওয়ার ১১ দিন আগেই চান্দ্রবছর শেষ হয়ে যায়৷ মানুষ যতদিন যাযাবর ছিল, পশুপালন করত, ততদিন চান্দ্রবছর নিয়ে সমস্যা ছিল না৷ বরং তীপ্র তাপদাহ এড়ানোর জন্য রাত্রে পাড়ি দিতে হত বলে চাঁদের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। তাছাড়া আকাশে সূর্যের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার চেয়ে চাঁদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল৷ কিন্তু মানুষ যত থিতু হতে শুরু করল, চাষবাস শিখল, তত চাঁদ দেখে দিনগোণার অসুবিধেগুলো প্রকট হতে শুরু করল৷ ফসল বোনা, ফসল তোলা এ সবই হয় ঋতু মেনে৷ দূরের নক্ষত্রমণ্ডলীর প্রেক্ষাপটে সূর্যের ঘুরে আসতে যে সওয়া ৩৬৫ দিন সময় লাগে ততদিনে সেটাও সেকালের জ্যোতির্বিদরা গণনা করে ফেলেছেন৷ তাই বছরের মাপ আর ঋতুচক্রের গরমিল মেটাতে প্রতি দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছরে একটা করে মাস ঢুকিয়ে দেওয়া হল৷ ফলতঃ সেই বছরে দিনের সংখ্যা হল ৩৮৩ (যদি বাড়তি মাসের দৈর্ঘ্য ২৯ দিন হয়) বা ৩৮৪ (যদি বাড়তি মাসের দৈর্ঘ্য ৩০ দিন হয়)৷ তাহলে পাঁচবছরের বছরের দিনসংখ্যার গড় হয়ে গেলঃ (৩৫৪+৩৮৩+৩৫৪+৩৫৪+৩৮৩)÷৫=৩৬৫.৮ বছর৷ অর্থাৎ ক্রান্তীয় বছরের অনেকটা কাছাকাছি৷ এইরকম ক্যালেন্ডারকে আমরা বলি সৌরচান্দ্র ক্যালেন্ডার (lunisolar calendar)৷

ওপরের দুধরণের ক্যালেন্ডারের মধ্যে চান্দ্র ক্যালেন্ডার ব্যবহার করেন মুসলিমরা, তাঁদের ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের জন্য৷ আর সৌরচান্দ্র ক্যালেন্ডার দেখে পূজো পার্বণ ঠিক করেন হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি রা৷ কিন্তু জাতিধর্ম নির্বিশেষে আমরা কাজের জন্য যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি তা উপরোক্ত কোন ভাগেই পড়েনা৷ হালখাতার সময় মিষ্টির প্যাকেটের সঙ্গে যেটা নিয়ে বাড়ি ফিরি সেই বাংলা ক্যালেন্ডারই হোক বা ভুলভাবে যাকে "ইংরেজি ক্যালেন্ডার" বলি সেই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার, যেটা দেখে আমি লেখার শুরুতেই বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের তারিখগুলো লিখেছি - এগুলো সবই হল সৌর ক্যালেন্ডারের (solar calendar) উদাহরণ৷ এখানে চাঁদের কোন ভূমিকা নেই৷ এই ক্যালেন্ডারে বছরের দৈর্ঘ্য ৩৬৫ দিন৷ পৃথিবীর পরিক্রমণ কালের সঙ্গে মেলানোর জন্য লিপ ইয়ার দিয়ে ম্যানেজ করা হয়৷ আর ৩৬৫ দিনকে ভাগ করে দেওয়া হয় বারোটা মাসের মধ্যে৷ ফলে মাসের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়ে গেল ৩০ বা ৩১ দিন৷ ফেব্রুয়ারি টা ব্যতিক্রম৷

ইসলামিক চান্দ্র ক্যালেন্ডার বা হিজরি ক্যালেন্ডারের মহরম মাসের দশ তারিখে আশুরা পালিত হয়৷ যেহেতু চান্দ্রবছর সৌরবছরের ১১ দিন আগেই শেষ হয়ে যায়, তাই মহরম মাসের দশ তারিখটা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি বছর ১১ দিন করে এগিয়ে আসে। হিন্দু বা বৌদ্ধদের তিথিগুলোর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে। কিন্তু সেগুলো যেহেতু সৌরচান্দ্র ক্যালেন্ডার মান্য করে তাই যে যে বছর একটা ২৯ দিনের বাড়তি মাস ঢুকে যায়, সেই সেই বছর একটা তিথি ১১ দিন এগনোর পাশাপাশি ২৯ দিন পিছিয়ে যায়। তাহলে কাটাকুটি করে কত পেছালো? ২৯-১১=১৮। হিন্দু সৌরচান্দ্র ক্যালেন্ডারে এই বাড়তি মাসটাকে বলা হয় অধিক মাস বা মল মাস। এবার অধিক মাসটা কোন বছরে ঢুকবে তা কি পঞ্জিকাকারদের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করে? একেবারেই না। তারও একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। বৌদ্ধ বা ইহুদিদের ক্যালেন্ডারে অধিক মাস ঢোকানো হয় একটা নির্দিষ্ট মাসের পর। হিন্দু ক্যালেন্ডারের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। 


আমাদের দেয়ালে বা কব্জিতে যেমন একটা ঘড়ি আছে, তেমনি আকাশেও একটা ঘড়ি আছে। দেয়াল বা কব্জির ঘড়ি ২৪ ঘন্টার সময় মাপে, আর আকশের ঘড়ি মাপে ১ বছর। সেই ঘড়ির কাঁটা হল সূর্য আর সংখ্যা গুলো হল বারোটা নক্ষত্র মণ্ডলী, যাদের আমরা রাশিচক্র বলে থাকি। সূর্য এক মাস করে এক একটা রাশির ঘরে থাকে। এই রাশিচক্র কে ব্যবহার করে একশ্রেণির লোক মানুষকে প্রতারিত করে ব্যবসা চালায় এই বলে যে রাশিচক্রের ওপর নাকি মানুষের ভাগ্য নির্ভর করে। অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি এইসমস্ত বুজরুকিতে বিশ্বাসও করেন। বাস্তবে প্রাচীনযুগে কাল ও দিক নির্ণয় এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই রাশিচক্রের কল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ভাগ্যের সঙ্গে এগুলোর কোন যোগাযোগ নেই। সে কথা থাক, ঐ যে বললাম সূর্য একমাস করে এক একটা রাশির ঘরে থাকে, এই মাস হল সৌরবছরের মাস, যার দৈর্ঘ্য চান্দ্রমাসের থেকে বেশী। অর্থাৎ একটা সৌরমাসের মধ্যে একটা গোটা চান্দ্রমাস ঢুকে যেতে পারে। সেরকম হলে ঐ চান্দ্রমাসে সূর্য একটা রাশিতেই থেকে যাবে, অন্য রাশিতে যাবেনা। সেই মাসটাকেই বলা হবে অধিক মাস। এইবছর হিন্দু ক্যালেন্ডারের ভাদ্র মাসের পরের মাসটা ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ই অক্টোবর এইরকমই একটা অধিক মাস। এর নাম হল অধিক আশ্বিন। অধিক আশ্বিনের পরে আসবে আসল আশ্বিন, যে মাসে এবার দুর্গাপুজো হবে। বাংলা সৌরক্যালেন্ডারে অবশ্য ততদিনে অশ্বিন পেরিয়ে কার্তিক মাস চলে আসবে। তাহলে ১১ আর ১৮র গেরোটা বোঝা গেল। 

বাকি রইল ১-২ দিনের তারতম্য। অধিক মাস যদি ৩০ দিনের হয় তাহলে ১৮ দিনের বদলে ১৯ দিন পিছবে। আবার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের বছরটা অধিবর্ষ হলে একটা তিথি ১১ দিনের বদলে ১২ দিন এগোবে। সুতরাং এইবছর হিন্দু সৌরচান্দ্র ক্যালেন্ডারে দুটো আশ্বিন মাসঃ একটা অধিক আশ্বিন, আরেকটা আসল বা নিজ আশ্বিন। কিন্তু দুর্গাপুজো যদি নিজ আশ্বিনে না হয়ে অধিক আশ্বিনে হত তাহলেই তো আর এই মহালয়ার পর একমাস অপেক্ষা করার কারণ থাকত না। এর কারণ অবশ্য এই কুসংস্কার যে অধিক মাসটা মলমাস, এই মাসে কোন শুভ অনুষ্ঠান করতে নেই। বাস্তবে যদিও আমরা দেখলাম যে "অধিক মাস" এর উদ্দেশ্য সৌরচান্দ্র ক্যালেন্ডারের সঙ্গে ঋতুচক্রের সামঞ্জস্যবিধান। এর সঙ্গে মানুষের শুভ অশুভের কোন সম্পর্ক নেই।

এবার বিশ্বকর্মা পুজোর কথায় আসি। হিন্দুধর্মের অন্যান্য উৎসবের মত বিশ্বকর্মা পুজো সৌরচান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পালিত হয় না। সূর্য যখন সিংহ রাশি ছেড়ে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে সেই দিনটাই বিশ্বকর্মা পুজোর জন্য নির্ধারিত। এবং এই দিনটা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ১৭ই সেপ্টেম্বরের আশেপাশেই পরে। বিশ্বকর্মা শিল্প-স্থাপত্যের দেবতা। হিন্দুরা যতদিনে কৃষিকাজের পাশাপাশি শিল্পকর্মেও পারদর্শী হতে শুরু করেছিল ততদিনে সম্ভবত আকাশে সূর্যের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা শিখে গিয়েছিল আর বর্ষ গণনার জন্য সূর্যের গুরুত্বও বুঝেছিল। তাই বিশ্বকর্মা পুজো হয় সৌর ক্যালেন্ডার মেনে। বিশ্বকর্মা পুজোর মতই আরেকটা পুজোও আছে যেটা সৌর ক্যালেন্ডার মান্য করে। কার্তিক পুজো হয় বাংলা কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে অর্থাৎ ৩০শে কার্তিক। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারে তারিখটা নভেম্বর মাসের ১৬-১৭ নাগাদ পড়ে। অন্য কারো মনে হয় কি না জানি না, কিন্তু আমার তো বিশ্বকর্মা ঠাকুরের মুখের সঙ্গে কার্তিক ঠাকুরের মুখের বেশ মিল লাগে। দুই ভাই বলে দিব্যি চালিয়ে দেওয়া যায়! 

অনেকগুলো ধর্মের উৎসবের তারিখ নিয়ে বকবক করলাম। খ্রিষ্টধর্ম বাদ গেল কেন? ষোড়শ শতাব্দীতে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারের সংশোধন করেছিলেন পোপ দ্বিতীয় গ্রেগরি। প্রোটেস্টান্টরা গোড়ায় এই ক্যাথলিক সংস্কারকে মানতে পারেনি। ব্রিটেন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণ করেছিল দুশো বছর পরে, অষ্টাদশ শতকে। তবু আমরা এটাকে "ইংরেজি ক্যালেন্ডার" বলে থাকি! সে যাই হোক খ্রিস্টধর্মের উৎসবগুলোর বেশীরভাগই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পালিত হয়। তাই বড়দিন হয় প্রতি বছরই ৩১শে ডিসেম্বর। হ্যালোউইনের তারিখ ৩১শে অক্টোবর। তবে কিছু উৎসব আছে, যেমন ইস্টার, যেগুলোর তারিখ হিব্রু সৌরচান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঠিক হয়। 

শেষ করার আগে একটা কথা বলে রাখা জরুরী। মানুষের আত্মা বলে যদি কিছু থেকেও থাকে তা শারীরিক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ধ্বংস হয়ে যায়। দেহের অতীত আত্মা বলে কিছু হয় না। মহালয়ার সকালে গঙ্গার ধারে তর্পণ করলে তা পূর্বপুরুষের কানে পৌঁছানোর কোন সম্ভাবনা নেই। মহিষাসুর বধের কাহিনীর পেছনে যদি কোন সত্যি যুদ্ধের ইতিহাস থেকেও থাকে সেই যুদ্ধের কুশীলবরা সব মানুষই ছিল, কোন দেবতা বা অসুর নয়। নির্ঘন্ট মেনে পুজোআচ্চা পৈতাধারী কিছু লোকের উপার্জনের রাস্তা মাত্র। অমুক ষষ্ঠী, তমুক একাদশী বা গোটা রমজান মাস জুড়ে উপবাসে কোন পুণ্য সঞ্চয় হয় না। নিজ পথে স্থিত থেকে শাসকের প্রতিহিংসার শিকার হওয়া যিশুখ্রিষ্ট বা ইমাম হোসেন অবশ্যই শ্রদ্ধার পাত্র। আজকের যুগে যাঁরা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষমতামদমত্ত শাসকের রোষের শিকার হচ্ছেন, যিশুখৃষ্ট বা ইমাম হোসেনের লড়াই থেকে তাঁরা প্রেরণা পেতেই পারেন। কিন্তু যিশুর পুনর্জন্ম যে গাঁজাখুড়ি গপ্পো মাত্র, ইমাম হোসেনের শোকে নিজদেহকে রক্তাক্ত করার পেছনে যে কোন যুক্তি নেই এই কথাগুলো মনে রাখা প্রয়োজন। সমস্ত ধর্মীয় প্রথা যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও সেইসব প্রথার দিনক্ষণ কিন্তু ঠিক হয় একদম জ্যোতির্বিজ্ঞানের অঙ্ক মেনেই। 

তথ্যসূত্রঃ অধ্যাপক পলাশ বরণ পালের বিভিন্ন ভাষণ, অনুষ্টুপ পঞ্জিকা সংখ্যা ২০১৬, উইকিপিডিয়া। অনুপ্রেরণায় শ্রীরূপা ঘোষ কুমার।

Saturday, 20 June 2020

সূর্যগ্রহণ নিয়ে কিছু কথা।

আজ আকাশে করোনা দেখা যেতে পারে৷ না, করোনা ভাইরাস নয়৷ সূর্যের মুকুট অর্থাৎ বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে বাইরের অংশ হল করোনা৷ সাধারণ সময়ে আমরা সূর্যের যে অংশটা দেখি তা হল ফটোস্ফিয়ার৷ তার বাইরে ক্রোমোস্ফিয়ার এবং করোনা ফটোস্ফিয়ারের থেকে অনেক বেশী উত্তপ্ত হলেও পদার্থের ঘনত্ব খুব কম হওয়ার কারণে ঐ অঞ্চলগুলোর উজ্জ্বলতাও কম৷ তাই করোনাকে দেখা সম্ভব যদি ফটোস্ফিয়ারকে পুরোপুরি আড়াল করে দেওয়া যায়৷ পুরোপুরি না হলেও কাল ফটোস্ফিয়ারকে প্রায় ৩৯ সেকেন্ডের জন্য অনেকখানি ঢেকে দেবে চাঁদ৷ এত ভ্যানতাড়া করে যেটা বললাম সেটা হল আজ সূর্যগ্রহণ৷ বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ৷ তিনটে মহাজাগতিক ঘটনা যুগপৎ ঘটলে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটতে পারে৷ (১) সূর্য ও চাঁদ উভয়েই পৃথিবীর একই দিকে থাকবে (যা প্রতি অমাবস্যাতেই ঘটে), (২) সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ একই তলে থাকবে, (৩) পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব সর্বাধিক হবে৷ এর মধ্যে প্রথম দুটো শর্ত পূরণ হলেই সূর্যগ্রহণ ঘটে৷ কিন্তু বলয়গ্রাস অর্থাৎ আগুণের আংটি দেখার জন্য চাই তৃতীয় শর্তটাও৷ তৃতীয় শর্ত পূরণ না হলে চাঁদ গোটা সূর্যটাকেই ঢেকে ফেলবে, যাকে আমরা বলি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ৷ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময়েই অবশ্য করোনা কে ভালোভাবে দেখা যায়৷ আজ আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেই আগুণের আংটি দেখতে পাবো না৷ সূর্যের কেন্দ্রর সঙ্গে চাঁদের কেন্দ্রকে যদি একটা সরলরেখা দিয়ে যুক্ত করা হয়, সেই সরলরেখা পৃথিবীর ওপর যে রাস্তা দিয়ে যাবে, সেই রাস্তা থেকে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে৷ ভারতের মধ্যে বলয়গ্রাসের রাস্তাটা পাকিস্তান থেকে ঢুকে রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ডের ওপর দিয়ে তিব্বতের দিকে চলে যাবে৷ তবে আমাদের একেবারে হতাশ হওয়ার কিছু নেই৷ বলয়গ্রাস না হলেও আংশিক সূর্যগ্রহণ আমরা দেখতে পাবো সকালে পৌনে এগারোটা থেকে দুপুর সওয়া দুটো পর্যন্ত৷ সাড়ে বারোটা নাগাদ চাঁদ সূর্যের প্রায় ৬৫% ঢেকে যাবে৷

এতক্ষণ যা বকবক করলাম তা মোটামুটি সবাই ছোটবেলায় ভূগোল বইয়ে পড়েছেন৷ তবু ঐ জানা কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হল এটা আরেকবার বুঝে নেওয়া যে সূর্যগ্রহণ একেবারেই একটা মহাজাগতিক জ্যামিতির খেলা৷ হিন্দু পুরাণে ও জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী সূর্যগ্রহণের সময় রাহু নামক একটা দৈত্য সূর্যকে গিলে ফেলে৷ শাস্ত্রের নির্দেশঃ গ্রহণ চলাকালীন কিছু খাওয়া যাবে না, রান্না করা খাবার ফেলে দিতে হবে, গ্রহণ শেষ হয়ে গেলে বাসনপত্র ভালো করে মাজতে হবে, বাইরে বেরনোর জামাকাপড় কেচে ফেলতে হবে৷ গর্ভবতী মহিলারা গ্রহণের সময় বাইরে বেরোলে গর্ভের শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে যাবে ইত্যাদি৷ ইসরো যখন চাঁদে মহাকাশযান পাঠাচ্ছে আর সেই খবর ভারতবাসী গর্বের সঙ্গে শেয়ার করছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে লোকে এইসবে বিশ্বাস করবে - এটা মানতে মন চায় না৷ তবু বাস্তব বড় বিচিত্র৷ বহু উচ্চশিক্ষিত মানুষও জন্মলগ্নে সূর্য কোন রাশির সামনে ছিল তার ওপর নিজের ভাগ্য নির্ভর করে, আঙুলে কিছু পাথর ধারণ করে সেই ভাগ্যকে বদলে ফেলা যায় বলে বিশ্বাস করেন! তারওপর এখন এইসমস্ত কুসংস্কারকে হাজির করা হচ্ছে বিজ্ঞানের মোড়কে! সূর্যগ্রহণের সময় নাকি সূর্যের আলো কমে যাওয়ার কারণে জীবাণুদের দাপট বেড়ে যায়৷ তাই যদি হত তাহলে তো মনুষ্যপ্রজাতি কবেই বিলুপ্ত হয়ে যেত! প্রতিদিন তো বারোঘন্টা করে সূর্যের আলো থাকে না, মেঘ করলে দিনের বেলায়ও সূর্যের আলো কমে যায়! জনৈক "বিজ্ঞানী" শুনলাম বলেছেন যে সূর্যগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই করোনা ভাইরাস পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে৷ এইসব মহাজাগতিক ঘটনার সঙ্গে যে মানুষের বা জীবজগতের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই তা জোরের সঙ্গে বলা দরকার৷ তাই নির্ভয়ে যেকোন জায়গায় যান, পছন্দের খাবার খেতে খেতে সূর্যগ্রহণ দেখুন৷

তার মানে অবশ্য এটা নয় যে সূর্যগ্রহণের সময় কোনরকম সতর্কতার প্রয়োজন নেই৷ ভুলেও খালিচোখে বা রোদচশমা দিয়ে সূর্যগ্রহণ দেখতে যাবেন না৷ সূর্যের আলো সরাসরি চোখে পড়লে রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে৷ সূর্যগ্রহণ দেখুন সোলার ফিল্টারের সাহায্যে বা পিনহোল ক্যামেরা বানিয়ে৷ আর সূর্যগ্রহণ দেখার উৎসাহে স্যোসাল ডিস্ট্যান্সিং ভাঙবেন না৷ সূর্যের করোনা পৃথিবীর করোনা কে নিকেশ করতে পারবে না৷


আজকের দিনটা আরেকটা কারণেও বিশিষ্ট৷ আজ কর্কট সংক্রান্তি৷ সূর্য উত্তরায়ণ শেষ করে দক্ষিণপন্থী হবে৷ সূর্যের আলো পৃথিবীর ওপর সবচেয়ে তেরছা ভাবে পড়বে৷ যার ফলে উত্তর গোলার্ধে আজ সবচেয়ে বড় দিন আর সবচেয়ে ছোট রাত্রি৷ একটা দিন নাহয় ধর্ম, বর্ডার, ডিপ্রেশন এইসব তুচ্ছ জিনিস ভুলে মহাকাশের কাণ্ডকারখানা অনুভব করার চেষ্টা করি৷

ছবিতে রইল পিনহোল ক্যামেরায় তোলা গ্রহণ চলাকালীন সূর্যের ছবি। ফেসবুক লিঙ্ক