Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Saturday, 13 March 2021

পাগলা জগাই

"পাগলা জগাই" গল্পটি জয়ঢাক বসন্ত ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পূর্ণ গল্পটি পড়ার লিঙ্কঃ

পাগলা জগাই, অতনু কুমার, জয়ঢাক, বসন্ত ২০২১






Tuesday, 2 June 2020

একটি হাতির মৃত্যু


হাতিটা যখন গ্রামে ঢুকল, এদিক ওদিক ঘুরে মাঠের মধ্যে পড়ে থাকা আনারসটা মুখে পুরল, আমি গাছের তলায় বসেছিলাম৷ কাউকে কিছু বলিনি৷ খাবার যখন পেয়ে গেছে চলে যাবে৷ ওরা আবার জানতে পারলে ... কিন্তু তার আগেই বিকট শব্দ৷ তাকিয়ে দেখলাম হাতিটার মুখ রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে৷ সে ছটফট করতে করতে সারা গ্রামে ছুটে বেড়াতে লাগল৷ ততক্ষণে সবাই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছে৷ কিন্তু হাতিটা কাউকে কিছু বলল না৷ কারো বাড়িতে হামলা চালালো না৷ কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করার পর পুকুরে নেমে গিয়ে মাঝপুকুরে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ পুকুরে অবশ্য জল প্রায় নেই৷ কতদিন বৃষ্টি হয়নি৷
কোতোয়াল কে দেখতে পেয়ে দৌড়ে গেলামঃ
"হাতিটার কি হল? আনারসের মধ্যে কি ছিল?"
কোতোয়াল অট্টহাসি হেসে বলল, "ঠুসে বারুদ ভরা ছিল৷ ব্যাটা ঠিক টোপ গিলেছে৷"
"সে কি? দয়া করে কিছু করুন৷ ওকে বাঁচান৷"
ততক্ষণে গোস্বামী চলে এসেছে, "কেন রে ব্যাটা? হাতিদের ওপর তোর অত দরদ কেন? গেল বার যখন হাতিটা আমার কলাগাছগুলো উপড়ে নিল তখন তুই কোথায় ছিলিস?"
পাশ থেকে সরকারমশাই ফুট কাটলেন, "হাতিদের তোল্লাই দিয়ে দিয়েই এই অবস্থা হয়েছে৷ সে আগে যা হওয়ার হয়ে গেছে৷ রাজামশাই আসার পর এখন আর হাতিরা মানুষকে ভয় দেখাতে পারবে না৷"

প্রচণ্ড রাগে গা জ্বলতে লাগল আমার৷ এটা তাহলে রাজামশাইয়ের হাতি মারার নতুন কৌশল৷ দিন পনেরো আগে একটা হাতিকে বিষ খাইয়ে মেরেছিলেন৷ তার আগে একটাকে ফাঁদে আটকে গ্রামের সবাই মিলে খুঁচিয়ে মেরেছিল৷ এবার বোঝা গেল পরশু কেন রাজামশাই বণিকটার কাছ থেকে বারুদ কিনছিলেন৷ বললাম, "তাই বলে এত নৃশংসভাবে মারতে হবে?"
কোতোয়াল এক ধমক দিয়ে বলল, "চোপরাও রাজদ্রোহী! আর একটা কথা বললে তোকেও ঐরকম একটা আনারস খাইয়ে দেবো৷"
গোস্বামী বলল, "সেই হাতিটা যখন পণ্ডিতের বাড়ি ভেঙে দিয়েছিল তখন তুই কোথায় ছিলিস?"
আমার বলা হল না, পণ্ডিত এখনও মন্দিরের বেদীতে শুয়ে থাকে কেন? রাজামশাই কি ওর জন্য ছোটখাটো একটা ঘর বানিয়ে দিতে পারতেন না? পণ্ডিতের সেই ভাঙা ঘরটাকেও উনি সারাতে দেন নি৷ প্রত্যেকবার একটা করে মারা হয় আর রাজামশাই ঐ ভাঙা ঘরটা দেখিয়ে বলেন, হাতিরা কত বিপদ্জনক৷

তাকিয়ে দেখলাম হাতিটা পুকুরের মধ্যেই শুয়ে পড়েছে৷ তার নড়াচড়াও প্রায় থেমে গেছে৷ সারা গ্রামের লোক মহা উৎসাহে দেখছে হাতিটার মরণযন্ত্রণা৷ পরশু যখন বারুদের দাম বাবদ প্রত্যেক গ্রামবাসীর কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হল সবার মধ্যে চাপা ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল৷ এবছর অনাবৃষ্টিতে ফসল হয়নি বললেই চলে৷ তবু রাজার পেয়াদারা প্রত্যেকের ঘর থেকে খাজনা আদায় করে নিয়ে গেছে৷ যারা দিতে পারেনি তাদের আটক করেছে৷ তার ওপর চাঁদা তুলে বারুদ কেনায় লোকে তো খেপবেই৷ এখন তাদের ক্ষোভ মিটে গেছে৷ হাতি মারার উত্তেজনায় সবার চোখ জ্বলজ্বল করছে৷

হঠাৎ জোয়ান ছেলে নাথুরাম কপালে একটা ফেট্টি বেঁধে পুকুরের জলে লাফ দিল৷ হাতে একটা বিশাল বল্লম৷ গ্রামের লোক হোওওও করে চেঁচিয়ে উঠল৷ ঠিক হাতিটার তলপেটের কাছে গিয়ে পরপর কয়েকবার বল্লম চালালো৷ তারপর হাতিটার দেহের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে বল্লমটা মাথার ওপর তুলে চিৎকার করল, "জয়! রাজামশাইয়ের জয়!" বল্লমের ডগায় তখন একরত্তি একটা খেলনা হাতি৷ গ্রামের সব লোক উল্লাসে গলা মেলালঃ "জয়! রাজামশাইয়ের জয়!"

Sunday, 14 May 2017

ন্যাদোশ

ঝড়বৃষ্টি হয়ে ওয়েদারটা বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তেতলায় চিলেকোঠার ঘরে চিৎ হয়ে শুয়ে ফেসবুকে কি স্ট্যাটাস দেওয়া যায় ভাবছিলাম। হঠাৎ জানলা দিয়ে খচমচ করে কি যেন ঘরে এসে পড়ল। পাশের আমগাছ টা কদিন ধরেই হনুমানদের দখলে। তারাই কেউ ঢুকে পড়ল না কি ভেবে ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি, হনুমান তো নয়, ইয়াব্বড় শিংওলা একটা গরু লগবগ করতে করতে ঠ্যাং ছড়িয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। গল্পের গরু গাছে ওঠে বলে জানি, কিন্তু তিনতলায় ওঠা গরুর কথা তো আগে শুনিনি। আরেকটু হলেই ভির্মি খেতাম, কিন্তু গরুটা এমন মানুষের গলায় কথা বলে উঠল, যে ভির্মি খাওয়া ভুলে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।

"মুখ বন্ধ কর, গলায় মশা ঢুকে যাবে। অত অবাক হওয়ার কি আছে শুনি? গরু দেখোনি না কি?"
"নাআআ কিন্তু ..." কথা বলব কি, গলা আটকে যাওয়ার জোগাড়।
"আরে বাবা দিদির খোঁজে এসেছিলাম। তা দিদি তো শুনলাম দ্যুলোকে পাড়ি দিয়েছেন। কোথায় যাব ভাবছিলাম, তারপর জানলা দিয়ে তোমায় দেখে বোকাসোকা ভালোমানুষ মনে হল তাই ঢুকে পড়লাম।"
"দিদি ???"
"দিদি মানে তোমরা যাঁকে মহাশ্বেতা দেবী বল। পাশে সন্দেশ পত্রিকাটা ওল্টানো রয়েছে দেখতে পাচ্ছি, অথচ আমায় চিনতে পারছ না?"
"ন্যা ন্যা ন্যা ..."
"এই তো মাথা খুলেছে, গলাটা খুলছে না কেন। হ্যাঁ আমিই ন্যাদোশ। যাক গে শোন আমি গোলোক থেকে আসছি। গোলোক বোঝ তো? তুমি আবার যা হাঁদাগঙ্গারাম! মানুষ মরলে যেমন দ্যুলোকে যায়, গরু মরলে তেমনি গোলোকে যায়।"
বোতল থেকে দু-ঢোক জল খেয়ে আর ঘাড়ে মাথায় একটু ছিটিয়ে খানিকটা ধাতস্থ হয়ে বললাম, "হ্যাঁ জানি বইকি। সন্দেশে পড়েছি। তুমি মহাশ্বেতা দেবীর পোষা গরু ছিলে। তুমি না কি মাছ মাংস খেয়ে গিনেস বুকে নাম তুলেছিলে?"

"সেসব দিনের কথা আর বোলো না। গো-লোকে এখন মাছ মাংসের সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। কতদিন যে বীফ খাইনি!" উদাস চোখে জানলা দিয়ে তাকিয়ে বলল ন্যাদোশ।
"তুমি বীফ খেয়েছো? এটা তো একরকমের ক্যানিবলিজম! গরু হয়ে গরুর মাংস খাওয়া!"
"আরে রাখো তোমার ইজমের কচকচি। গো-লোকে ক্যানিবলিজম, ন্যাশনালিজম কোন ইজমই নেই। আরে বাবা যে গরুর মাংস খেয়েছি সে তো মরে গিয়ে আমাদের সঙ্গেই যোগ দিয়েছে, না কি?"
মাথা চুলকে বল্লুম, "হুম্ম। ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে দেখছি"
"গোলমেলে আবার কিসের? তোমরা মানুষরা বড্ড বেশী ভাবো। ঐজন্যেই তোমাদের মাথা আউলায়ে যায়। এই তোমাদের জন্যেই মর্ত্য থেকে মাংস রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন অবশ্য গো-লোকে কাউলেস বীফ আসছে।"

"কাউলেস বীফটা আবার কি?"
ন্যাদোশ দাঁত খিঁচিয়ে উঠল, "ক্যাশলেস ইকনমি বোঝ আর কাউলেস বীফ বোঝ না? কাউলেস বীফে মানুষের মাংস থাকে। যেসব মানুষ খাঁটি দেশপ্রেমিক নয় তাদের মাংস। ভালোই খেতে। সে যাক, যেজন্যে মর্ত্যে এসেছিলাম সেটা বলি। ভূলোকে নাকি আজকাল গরু খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে? আর গরুরা সব গোমাতা হয়ে যাচ্ছে?"
"হ্যাঁ সে তো ভালোই।"
"ভালো আবার কোথায় পেলে এর মধ্যে? পৃথিবীতে গরু মরছে না বলে তো গোলোকে পপুলেশন কমে যাচ্ছে। যে কটা গরু মরছে তারা গোলোকে না এসে গোমালোকে চলে যাচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে তো গোলোক পুরো ফাঁকা হয়ে যাবে!!"
"গোমালোক?"
"গোমাতা দের লোক আর কি!"
"ও আচ্ছা। তা গোলোক ফাঁকা কেন হবে বুঝলাম না। যারা এখনো গোলোকে আছে তারা তো আর দ্বিতীয়বার মরবে না?"

"তোমার দেখছি বিদ্যেবুদ্ধি কিস্যু নেই। বলি বিগ ব্যাং থিয়োরির কথা জানো? ইউনিভার্স যে এক্সপ্যান্ড করছে সে খবর রাখো? দ্যুলোক, গোলোক সবই তো ইউনিভার্সের গায়ে চাদরের মত জড়িয়ে আছে। তাই ইউনিভার্সের সঙ্গে সেগুলোও এক্সপ্যান্ড করছে। এখন নতুন গোরুরা ভূলোক থেকে না গেলে গোলোক ফাঁকা হয়ে যাবে না?"
মাথাটা আরো ঘুলিয়ে গেল। কিন্তু এর যা রকম সকম দেখছি বেশী প্রশ্ন করতে গেলে ঐ শিং দিয়ে গুঁতিয়ে না দেয়! তাই তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বললাম, "ও আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি।"

"এ আর না বোঝার কি আছে! যাই হোক আগে তো এসব সমস্যার কথা দিদিকে এসে বলতাম। দিদি অনেকবার দুঃখ দুর্দশার কথা কাগজে লিখেছেন। এখন দিদি নেই। তোমাকে পেলাম তাই বলে গেলাম। তোমাদের ঐ ফেসবুক না কি যেন আছে তাতে ছাপিয়ে দিও। আমি মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারি বলে গো-লোকের গোরুরা আবার আমাকেই প্রতিনিধি করে পৃথিবীতে পাঠায়।"
"মহাশ্বেতা দেবী তো দ্যুলোকে আছেন। তোমরা ওখানে গিয়ে ওনার সঙ্গে দেখা করতে পারো না?"
"আগে পারতাম। এখন আর পারি না। আমাদের আধার কার্ডের ব্যবস্থা হচ্ছে। ওটা হয়ে গেলেই যেতে পারব। তাছাড়া উনি তো নাস্তিক! দ্যুলোকে আছেন কি না তাও জানি না। তাই বলছি এসব কথা তোমাকেই লিখতে হবে।"
"নিশ্চয়ই। লিখবো তো বটেই। তোমার থুরি আপনার আদেশ কি অমান্য করতে পারি? গোমাতা বলে কথা!"
যেই না বলেছি, গরুটা বিষম রেগে শিং নেড়ে তেড়ে এলো, "গোমাতা বলে গাল দিচ্ছিস কেন রে? আমি গোমাতা নই, ন্যাদোশ" বলেই পেটে মারল এক গুঁতো।

চোখ মেলে দেখি গিন্নি পেটে খোঁচা দিচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে, "ওঠো ওঠো। ভরসন্ধেবেলায় চারটে মোটা মোটা বই আর মোবাইল নিয়ে নাক ডাকাচ্ছে। কি ঘুমোতেই না পারে লোকটা!"


ছবিটা "সন্দেশ" পত্রিকা থেকে নেওয়া। মহাশ্বেতা দেবীর "গল্পের গরু ন্যাদোশ" গল্পে সত্যজিৎ রায়ের অলঙ্করণ।

Sunday, 21 August 2016

হুতোম

তার নাম হুতোম। আমার খুব বন্ধু, যাকে বলে বেস্ট ফ্রেন্ড।
"সে কি তোমার ইস্কুলে পড়ে?" ... "না"
"তোমার বাড়ির পাশে থাকে বুঝি? বিকেলবেলায় তার সঙ্গে খেলো?" ... "ঊঁহু"
"তাহলে নিশ্চই তোমার আত্মীয় হয়?" ... "একেবারেই না"
আরে বন্ধু হলেই কেমন করে হয়েছে বলতে হবে না কি! সে যে আমার বন্ধু, এটাই তো সবচেয়ে বড় কথা। কোথায় থাকে? এই ধরে নাও পটলতলা। কি বলছ? পটলতলা কোন জায়গার নাম হতে পারে না? কেন? তালতলা হতে পারে, আমতলা হতে পারে আর পটলতলা হতে পারে না? আর না পারে তো বয়েই গেল, ধরে নিতে দোষ কি?
হুতোম সবসময় আমাকে সাহায্য করে। পড়ার সময়, খেলার সময়, ইস্কুল যাবার সময়, টিভি দেখার সময়। আমি ডাকলেই সে চলে আসে। তবে সাবধান, তোমাদের বিশ্বাস করে বলছি কিন্ত, কাউকে বলে দিওনা যেন, বিশেষ করে আমার বাবা মা কে। ওরা জানেই না হুতোমের কথা। জানেনা বললে অবশ্যি একটু ভুল হবে, জানতে চায় না, মানে বিশ্বাসই করে না।
এই তো সেদিন হুতোমের সঙ্গে পাঙ্খাটুলি গিয়েছিলাম, বাবার বন্ধু দেবেশকাকু দেখে ফেলেছে আর বাবাকে এসে রিপোর্ট করেছে।
বাবা চোখ পাকিয়ে বলল, "অতদূরে গিয়েছিলে কেন একা একা?"
"একা কোথায়! হুতোম ছিল তো সঙ্গে।"
"হুতোম আবার কে? কতবার বলেছি, ঐ সব বাজে ছেলেদের সঙ্গে মিশবে না?"
বোঝ কথা!! হুতোম না কি খারাপ ছেলে!! তাহলে ভালো ছেলে কারা? যারা সারাদিন বইমুখে বসে থাকে, সকাল বিকেল সেজেগুজে পড়তে যায়, বাসে বুড়োলোকেদের সিট ছেড়ে দেয়না, রাস্তায় আক্সিডেন্ট হলে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, তারা? এসব কথা অবশ্যি বাবাকে বলিনি। বলে কোন লাভ নেই। বয়স হলে বুদ্ধিটা যে কেন কমে যায় কে জানে!

একদিন বাবা-মার সঙ্গে বিয়েবাড়ি গিয়েছিলাম ট্রেনে চেপে। ফেরার সময় কি ভীষণ ঝড়বৃষ্টি। ট্রেন থেকে নেমে তো মাথায় হাত। বাস, অটো, রিকশো, কিচ্ছু নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাবা বলল, "বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই, আর কিছু পাওয়া যাবে না। এবার হাঁটা লাগাতে হবে।" ঠিক সেই সময় একটা অটো এসে দাঁড়াল। তখন আর দরদাম করার সময় নেই, হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। সে অটো কোথায় যাব কিছু না শুনেই রাস্তায় নেমে পাঁইপাই করে ছুটতে লাগল। মা তো ভয়ে সিটিঁয়ে গেছে। বাবা যত বলে আস্তে চালাতে সে তত জোরে চালাতে থাকে। আধঘন্টার রাস্তা দশ মিনিটে পার করে পয়সা দেওয়ার আগেই আমাদের নামিয়ে দিয়ে হুউউস করে বেরিয়ে গেল। বাবা-মা তো অবাক। আমি অবশ্য অবাক হইনি, কারণ আগেই বুঝতে পেরেছিলাম কে অটো চালাচ্ছে, কিন্তু সে চোখ দিয়ে ইশারা করাতে কিছু বলিনি। তবে হুতোম যে অটো চালাতে পারে তা আগে জানতাম না।
পরে হুতোমকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "তুমি অটো কিনলে না কি?"
"দ্যুৎ, তোমার যেমন বুদ্ধি! ওটা তো সামিরের অটো। সে ব্যাটা তো আর বেরোবে না, তাই আমিই নিয়ে এলাম। ও কিছু জানতেই পারেনি, কম্বলমুড়ি দিয়ে ঘুম দিচ্ছিল তো।"
"অ্যাঁ! তাহলে নিলে কিকরে? চুরি করেছ না কি?"
"চুরি করতে যাব কেন? আমি তো আবার রেখে এসেছি। তাছাড়া সামির আমার খুব ভালো বন্ধু, তোমার মতই।"


এই হল হুতোম। হুতোম পারেনা এমন কাজ বোধহয় নেই। কিন্তু সে যে কোন ক্লাসে পড়ে সেটা কিছুতেই বলবে না। তবে আমি যখনই ইস্কুলে যাই, তখন দেখি হুতোম জানলা দিয়ে থেকে বা গাছের ডাল থেকে উঁকি মারছে, কখনও বা আমার পাশে এসেও বসে পড়ে। কেবল আমিই ওকে দেখতে পাই, আর কেউ পায়না। তবে কোনদিন আমার হোমটাস্ক করে দেয়নি। যদিও আমি জানি ও অঙ্ক খুব ভালো পারে। কিন্তু সেকথা বললেই দুদিকে ঘাড় নেড়ে বলবে, "ওটি হচ্ছেনা, তোমার অঙ্ক তোমাকেই করতে হবে।"
আমাদের ইংরেজি স্যার সাংঘাতিক লোক। ছাত্রদের পেটাতেই তাঁর আনন্দ। তিনি ইচ্ছে করেই ভয়ংকর সব ট্রান্সলেশন দেন, বিচ্ছিরি সব শব্দের মানে জিজ্ঞেস করেন আর উত্তর অনুযায়ী বিভিন্ন রকম শাস্তি দেন। যারা মার খেল তাদের তবু ভাগ্য ভালো। কাউকে হয়ত বললেন চেয়ার, ব্যাস ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত শূন্যে চেয়ার হয়ে বসে থাকতে হবে। কাউকে যদি বলেন এক পা, অমনি এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
একদিন তিনি ভবানীকে ধরেছেন, "বলত ফুলিজিনাস মানে কি?"
ভবানী অনেকটা ভেবেচিন্তে, খানিকটা কানটান চুলকে বলল, "ফুলিজিনাস মানে ফুলিশ মানে বোকা কিন্তু জিনিয়াস"
"বেশ বলেছিস, ঠিক তোর মতই। আয় জিনিয়াসগিরি কাকে বলে দেখিয়ে দিই", স্যার ভবানীর কানের দিকে হাত বাড়াতেই হুতোম স্যারের কানটাকেই পাকড়ে ধরল। স্যারের মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেল। এদিকে হুতোমকে আমি ছাড়া কেউ দেখতে পাচ্ছে না। সবাই তাজ্জব। হুতোম স্যারের কানে কি একটা বলে ছেড়ে দিল। ভবানী সাহস করে জিজ্ঞেস করল, "কি হয়েছে স্যার?"
স্যার কিছু না বলে পেনটাকে পকেটে পুরে রোলকলের খাতাটা টেবিলেই ফেলে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।
হুতোমকে জিজ্ঞেস করলাম, "স্যারকে কানে কানে কি বললে তখন?",
"কিছু না, বললাম আপনি আসার সময় যে দুধটা না খেয়ে নর্দমায় ফেলে দিয়েছেন, তা কিন্তু আপনার স্ত্রী দেখে ফেলেছেন"

এই যে এতক্ষণ হুতোমকে নিয়ে আবোল তাবোল বকলাম, তোমরা নিশ্চই ভাবছ, হুতোমটা আসলে কে? মানুষ? ভূত? রোবট? না কি অন্য গ্রহের জীব? তোমরা ভাবতে থাকো, আমি যাই, হুতোম ডাকছে।


এটা কবে লিখেছিলাম মনে নেই, পুরনো খাতাপত্তর ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল। লেখাটা পাতে দেওয়ার মত হয়নি জানি, কিন্তু ছোটবেলার লেখার প্রতি সবারই তো একটা দুর্বলতা থাকে, তাই চর্যাপদের বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করছি। আর এটা যে খুব মৌলিক তাও আমি দাবী করছিনা। তবে কি না একজায়গা থেকে টুকলে সেটা হয় চুরি করা, আর অনেক জায়গা থেকে টুকলে গবেষণা। তাই কাঠগড়ায় তুললে আমি বলতেই পারি, ধর্মাবতার, আমি চোর নই, গবেষক হতে পারি বড্ডজোর। 
প্রথম প্রকাশঃ চর্যাপদ

Thursday, 31 October 2013

স্টপগ্যাপ

স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছি, তখনই সুতপার ফোনটা এল। আজ আগেও বেরোতে পারতাম। বৃহস্পতিবার লাস্ট পিরিয়ডে আমার ক্লাস থাকেনা। দেবেশদা আসেননি বলে ওনার ক্লাসে স্টপগ্যাপ হয়ে যেতে হল। বড়দের হলে ছেড়ে দেওয়া যেত, কিন্তু ক্লাস সিক্সের ছেলেদের স্কুল ছুটি হওয়ার আগে ছাড়া যায়না।

"হ্যাঁ বলো"
"তোমার ছুটি হয়েছে?"
"হ্যাঁ এই বেরোচ্ছি"
"তোমার এক বাল্যবান্ধবী এসেছেন, বাংলাদেশ থেকে"
আমার বাল্যবান্ধবী! তাও আবার বাংলাদেশ থেকে !!
"বাবার বন্ধুর মেয়ে, বারীনকাকা"
"বারীনকাকা! বল কি? ঠিক আছে আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।"

ফোনটা হাতে নিয়েই কয়েক মিনিট সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর ভোলাদা কে চাবি নিয়ে আসতে দেখে সম্বিত ফিরল। নেমে গ্যারেজ থেকে সাইকেলটা বের করলাম। বাইক একটা কিনেছি, কিন্তু একা থাকলে সাইকেল নিয়েই বেরোই।

বারীনকাকা! কতদিন পর এই নামটা শুনলাম! পাঠকরা যদি ভেবে থাকেন বাল্যপ্রণয়ের তাড়নায় আমার হৃদয়ে ঝড় উঠেছে তাহলে ভুল করবেন। কারণ বারীনকাকার মেয়ের সঙ্গে আমার আদৌ আলাপই হয়নি, কোনদিন দেখিওনি। বারীনকাকারা যখন এখান থেকে চলে যান তখন আমার বয়স নয় কি দশ বছর। ওনার নামটা আর বিক্ষিপ্ত কিছু স্মৃতি ছাড়া বিশেষ কিছু মনে নেই। পরে অবশ্য মা ও দিদিদের কাছ থেকে বারীনকাকার সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছি। বারীনকাকারা চট্টগ্রামের লোক, দেশভাগের সময় তাঁর বাবা-মা তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে এদিকে চলে এসেছিলেন। আমাদের বাড়ির কাছেই ভাড়া থাকতেন। বয়সের তফাত সত্ত্বেও বাবার সঙ্গে বারীনকাকার বন্ধুত্ব বেশ জমে গিয়েছিল। বাবা কমিউনিস্ট পার্টি করতেন আর বারীনকাকা সক্রিয় রাজনীতি করতেন না, তবে কংগ্রেস ঘেঁষা ছিলেন। সেই সময় অবশ্য রাজনৈতিক মতভেদ আজকের মত অস্পৃশ্যতায় শেষ হত না। দুই পরিবারে অত্যন্ত অন্তরঙ্গতা ছিল। বাবা যখন জেলে বা আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকতেন, বারীনকাকাই আমাদের পরিবারের অভিভাবক হয়ে উঠতেন। খুব কমবয়সে বাধ্য হয়ে ভিটেত্যাগ করলেও নিজের দেশের প্রতি বারীনকাকার একটা অদ্ভুত আবেগ ছিল বলে শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় না কি প্রচণ্ড অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, সারাদিন রেডিওর খবরের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকতেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বছর পাঁচেকের মধ্যেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে স্ত্রী ও অবিবাহিতা বোনকে নিয়ে দেশে ফিরে যান। বারীনকাকার ভাই গিরীনকাকা এখানেই রয়ে গিয়েছিলেন। প্রথমদিকে বেশ কিছুদিন অবধি চিঠিপত্রের চালাচালি হত, তারপর আস্তে আস্তে যোগাযোগটা বন্ধ হয়ে যায়। শুনেছিলাম বারীনকাকার স্ত্রী মারা গেছেন সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে। তার কয়েকবছর পরে বারীনকাকার মৃত্যুর খবর পেয়ে বাবা বেশ ভেঙে পড়েছিলেন মনে আছে।

পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে কুড়ি মিনিটের রাস্তাটা সাইকেলে পেরিয়ে এসেছি খেয়ালই নেই। ঘরে ঢুকে দেখি দুজন ভদ্রমহিলা আর একজন বয়স্ক যুবক সুতপার সঙ্গে কথা বলছে। "যুবক"টিকে চিনতে পারলাম, গিরীনকাকার ছেলে পিলু।
পিলু আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "কেমন আছ গ্যাঁড়াদা?"
"ভালো, তোর সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হল।"
"তোমাকে অবশ্য রাস্তায় দেখি মাঝে মাঝে। আলাপ করিয়ে দিই, জ্যাঠামশাইয়ের মেয়ে পূরবী আর ওর মাসি।"

পূরবী নমস্কার করে বললেন, "আমাকে পূরবী বলেই ডাকতে পারেন। আমি চিটাগং ইউনিভার্সিটিতে স্যোসিওলজি পড়াই। আপনাদের ফ্যামিলির কথা অনেক শুনেছি বাবার কাছে। আজ এখানে আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এসেছি অবশ্য একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। সত্যিকথা বলতে কি ইন্ডিয়াতেই এই প্রথম এলাম।"

কথায় কথায় পূরবীর ইন্ডিয়া সফরের বিশেষ উদ্দেশ্য জানা গেল। পূরবীর জন্মের দুদিন বাদে ওনার মা মারা যান। তারপর বারীনকাকা একই সঙ্গে মা ও বাবার ভূমিকা পালন করে মেয়েকে মানুষ করেন। অনেকেই দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কথা বললেও তিনি রাজি হননি। কিন্তু পূরবীর যখন চোদ্দ বছর বয়স, আচমকা হার্ট আটাকে চলে যান বারীনকাকা। তারপর পিসির কাছে থেকে বড় হন। পিসি ও পিসেমশাই খুবই ভালোমানুষ, নিজের দুই ছেলের সঙ্গে পূরবীকে নিজের মেয়ের মতই মানুষ করেছিলেন। দুই দাদা বিদেশে সেটল করার পর পিসি-পিসেমশাই এখন পূরবীর তত্বাবধানেই থাকেন।

"পিসি-পিসেমশাইকে আমি মা-বাবার মতই দেখি। তবু নিজের মা-র অভাবটা কোনদিন বোধ করিনি তা বলতে পারবনা। আর বাবার কথা ভাবলে মনে হয় এই তো সেদিন। বাবা নিজে জজমানি করতেন। গ্রামে বেশিরিভাগই মুসলিম হলেও বেশ কয়েকঘর হিন্দু আছে। তাদের যেকোন পুজো বা অনুষ্ঠানে বাবার ডাক পড়ত। আর হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই বাবাকে বেশ শ্রদ্ধা করত মনে আছে। বাবার ইচ্ছে ছিল আমি যেন অনেক পড়াশোনা করি, আনেক উঁচু জায়গায় যাই। একদিন মনে আছে মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে গেছে। দেখলাম বাবা বাইরের দাওয়ায় চুপ করে বসে আছেন। আমি আস্তে আস্তে বাবার পাশে গিয়ে বসলাম। সেদিন বোধহয় জ্যোৎস্না ছিল। সামনের বাগানটা চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল। বাবা আমার মাথাটা কোলে টেনে নিয়ে বললেন, লোকে বলে মানুষ মরে গেলে নাকি আকাশে চলে যায়। সত্যিমিথ্যে জানিনা, তবু মনে হয় যেন তোর মা দেখছে আমি তোকে কিভাবে মানুষ করছি। আমি তো বিশেষ লেখাপড়া করিনি, ঐ পুরুতগিরিটা জানি তাই চালিয়ে নিচ্ছি। তোর মা খুব বই পড়তে ভালোবাসত। তুই যখন পেটে, মা আমাকে বলত, ছেলে মেয়ে যাই হোক না কেন সে যেন অনেক পড়াশুনো করে, ডাক্তার বা বড় অধ্যাপক বা ওরকম কিছু হয়। দেখিস মায়ের স্বপ্ন যেন মিথ্যে না হয়।"

পূরবী একটু থেমে চশমা খুলে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখটা মুছলেন। সবাই চুপ। তারপর পূরবী নিজেই শুরু করলেন। "আমাদের ভার্সিটিতে রাজু চাকমা বলে একটা ছেলে আছে। গেল বছর ওদের একটা পরবে বন্ধুদের সঙ্গে আমাকেও নেমন্তন্ন করেছিল। ওদের পাহাড়ি গ্রাম, বাড়ি সব ঘুরিয়ে দেখাল। ওর পড়ার টেবিলের সামনেই এক মহিলার অস্পষ্ট ফটো। জানতাম ওরও খুব কমবয়সে মা চলে গেছে। ওকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু তারপর থেকে মনে হল রাজুর তো তবু কিছু আছে, একটা ছবি আছে, হয়ত মনের মধ্যে সযত্নে ঢেকে রাখা কিছু স্মৃতিও আছে। আমার তো সেসব কিছুই নেই। তাই ঠিক করলাম এবার মা-কে খুঁজতে যেতেই হবে।"

"ইন্ডিয়াতে আসার ইচ্ছে অনেকদিনই, কিছুতেই হয়ে ওঠেনা। তবে পিলুদার সঙ্গে যোগাযোগটা ছিল, ও একবার ঢাকায় ঘুরেও এসেছে। এবার একরকম জোর করেই চলে এলাম। এই প্রথম মামারবাড়ি গেলাম। তিন মামার মধ্যে দুজন মারা গেছেন আর ছোটমামার জন্মের আগেই মা-র বিয়ে হয়ে গেছিল। একমাত্র এই মাসিরই মা-র কথা মনে আছে।"
মাসি আমাদের বাড়ির দুটো পুরনো ছবির আলবাম দেখছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন। "দিদির চেয়ে আমি অনেকটাই ছোট, তবু আমরা খুব বন্ধু ছিলাম । যদিও দুজনের স্বভাব ছিল একেবারে উলটো। আমি ভীষণ দুরন্ত ছিলাম, সবাই বলে। আর দিদি ছিল শান্ত, অঙ্ক করতে খুব ভালোবাসত, সারাদিন বই মুখে নিয়ে বসে থাকত। আমি পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মিশে বদমায়েসি করে বেড়াতাম আর সেসব খবর বাবার কাছে আসত। বাবা খুব রাগী ছিলেন, কিন্তু দিদিকে খুব ভালোবাসতেন। আমাকে যে দিদি কতবার বাবার হাতে মার খাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে তার ঠিক নেই। পূরবীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে কত কিছু যে মনে পড়ছে ..."

পিলু বলল "কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে, জেঠিমার কোন ছবি তো পাওয়া যাচ্ছে না। আমার কাছে নেই, পূরবীর মামারবাড়িতেও পাওয়া গেল না। সেইজন্যেই আরো তোর কাছে নিয়ে এলাম। তোদের বাড়িতে তো তখন খুবই যাতায়াত ছিল আর অনেক ছবিও তোলা হত মনে আছে।"
পূরবী বললেন, "বৌদি দুটো আলবাম দিয়েছেন। মাসি দেখছে, আমি তো মা কে চিনতে পারব না।"
বারীনকাকার স্ত্রী, কি নাম ছিল মনে নেই, চেহারাটাও মনে আসছেনা। তবে বারীনকাকার বিয়েতে আমরা সবাই বরযাত্রী গিয়েছিলাম সেকথা বেশ মনে আছে। বললাম, "আর একবছর আগে এলে খুব ভালো হত। কাকিমার কোন ছবি থাকলে মা অবশ্যই জানতেন। মা মারা গেছেন গতবছর।"
পিলু বলল, "তুষারজ্যাঠা মারা গেছেন তিন সালে, না?"
"না, টু থাউজ্যান্ড ফোরের মার্চ।"

পূরবী আমাকে ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরিয়ে দিলেন। মনে পড়ছে সেই সময়ের পরিবেশ, মানুষজন। ছোটবেলায় বাবাকে সেভাবে আমরা পাইনি। বাবা পার্টির কাজে বাইরে ঘুরে বেড়াতেন, সেই আর্থিক অনটনের দিনগুলোয় মা কিভাবে আমাদের সাত ভাইবোনকে মানুষ করেছেন তা এখন ভাবাই যায়না। তখন অবশ্য বাবা-মারা সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে আজকের মত টেনশন করতেন না। মা রাজনীতি করতেন না, রাজনীতিকে খুব একটা পছন্দও করতেন না। কিন্তু যেকোন কারো বিপদ আপদে সব ফেলে ছুটে যেতেন। প্রায় রোজই এলাকার কোন না কোন মহিলা আসতেন তাঁদের পারিবারিক সমস্যা নিয়ে। মা তাদের বোঝাতেন, কখনও কখনও নিজে তাঁদের বাড়ি গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতেন। মা শিক্ষিত ছিলেন, কলেজেও পড়েছেন, কিন্তু চাকরি করেননি। পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। তাতে কত আর রোজগার হত, বেশীরভাগই তো মাইনে দিতে পারত না। তাতে কি, সকল শিশুই ছিল মায়ের সন্তানের মত। মা আমার জীবনে কি ছিলেন, তা আগে কোনদিন এভাবে অনুভব করিনি। আজ পূরবীর কথা শুনে বুঝতে পারলাম যে আমি কত ভাগ্যবান।

সুতপা সবার জন্য চা, মিষ্টি, সিঙ্গাড়া নিয়ে ঘরে এল। ও বোধহয় ম্যাজিক জানে, এসবের ব্যবস্থা কিভাবে করল কে জানে। আমারই উচিৎ ছিল বাড়ি আসার সময় কিছু নিয়ে আসা। স্মৃতিমন্থনে ডুবে গিয়ে সেসব ভুলেই গিয়েছি। সুতপা বলল, "তুমি আসার আগে বড়দাকে ফোন করেছিলাম। কাকিমা মানে পূরবীদির মার কোন ছবি আছে বলে তো মনে করতে পারলেন না।"

পিলু বলল, "আমার যেন মনে হচ্ছে তুষারজ্যাঠার সঙ্গে জ্যাঠা-জেঠিমার একটা ফটো তোলা হয়েছিল, আমিও ছিলাম সেখানে। আমি অবশ্য তখন খুবই ছোট।"
"আলবামদুটোয় কিছু পেলেন না?" মাসিকে জিজ্ঞাসা করলাম। "অনেক পুরনো ছবি, বেশীরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে।"
"এইটা একবার দেখুন তো", মাসি অ্যালবামটা এগিয়ে দিলেন।
ছোট্ট ছবি। দুজন পুরূষের মাঝখানে একজন মহিলা, মহিলার সামনে একটা বাচ্ছা। তবে ছবির বাঁদিকটা প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। ডানদিকের পুরূষটির ওপর আঙুল দেখিয়ে পিলু বলল, "এটা তো জ্যাঠা?"
সেবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আর বাঁদিকের পুরূষটি সম্ভবতঃ বাবা। "এটা সিওর আমি", বাচ্ছাটাকে দেখিয়ে বলল পিলু।

পূরবী উত্তেজিত হয়ে বললেন, "তাহলে কি ..."
"মনে তো হচ্ছে ... তবে ছবিটার যা অবস্থা, আপনার বোধহয় খুব একটা লাভ হবেনা" ছবিটা আলবাম থেকে খুলতে খুলতে বললাম।
পূরবী জলভরা চোখে বললেন, "যা পেয়েছি তাই যথেষ্ট। দেখি কোনভাবে রিকভার করা যায় কি না ... আপনাকে যে কি বলে ..."
"কিছুই বলতে হবেনা, শুধু কথা দিন যখনই এদেশে আসবেন আমাদের বাড়ি ঘুরে যাবেন।"

পূরবী কথা দিলেন এবং আমাদেরকেও বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য নেমন্তন্ন করলেন। বললেন উনি পরশু ফিরে যাচ্ছেন। আগামীকাল কলকাতাটা একটু ঘুরে দেখবেন।

ওঁদের বিদায় জানিয়ে ঘরে এসে সুতপা জিজ্ঞাসা করল, "ছবিটা কি সত্যিই পূরবীদির মা-র ছিল?"
"নাহ, আমি ভালো করেই জানি ওটা মা-র ছবি। আর বাচ্ছাটাও পিলু নয়, স্বয়ং আমি। তবে পূরবী যদি আমার মা-র মধ্যেই ওঁর মা-কে খুঁজে পান তাহলে ক্ষতি কি?"
সুতপা কিছু না বলে চোখ দিয়ে সমর্থন জানাল। আমি আলবাম দুটো খুলে পাতা ওলটালাম। ধাপ্পাটা আশা করি পূরবী ধরতে পারবেন না।

প্রথম প্রকাশঃ অবকাশ, পুজো ১৪২০

Sunday, 29 September 2013

ইচ্ছাপূরণ

সুবলচন্দ্রের ছেলেটির নাম সুশীলচন্দ্র। সকল সময় নামের মত মানুষটি হয়না বটে, কিন্তু ইহাদের ক্ষেত্রে নাম ও স্বভাবের আশ্চর্য্য সাদৃশ্য লক্ষ্য করা গেছে। সুশীলচন্দ্র শান্ত, নম্র ও লেখাপড়ায় অতিশয় মনোযোগী। অপরদিকে বয়সের কারণে নানা আধিব্যাধিতে ব্যতিব্যস্ত হইলেও যৌবনে সুবলচন্দ্র রীতিমত বলশালী ছিলেন। 

সুশীলচন্দ্র ইস্কুলে পড়ে। পড়াশোনায় সে যেমন মেধাবী, খেলাধূলায় তেমনি দড়। বাড়িতে তাহার বন্ধুবান্ধবদের অবারিত দ্বার। আজ সুবলবাবু তাঁহার দৈনন্দিন বৈকালিক আড্ডার পর বাড়ি আসিয়া দেখিলেন সুশীলচন্দ্রের সহিত একটি কিশোরী গল্প করিতেছে। টিউশন ইত্যাদির দৌলতে সুশীলচন্দ্রের বান্ধবীর সংখ্যা নেহাত অল্প নহে। এই মেয়েটিকে অবশ্য আগে দেখেননি। সে সুবলচন্দ্র কে প্রণাম করিয়া বলিল, "কাকু, আমি দামিনী, সুশীলের বন্ধু"। সুবলচন্দ্র তাহার মাথায় হাত রাখিয়া আশীর্বাদ করিলেন বটে কিন্তু তাহার স্কার্টের নীচ দিয়া প্রসারিত শ্বেতশুভ্র পদদ্বয় ও বক্ষের উপর প্রস্ফূটিত নিটোল স্তনযুগলের আভাসে সুবলচন্দ্রের শরীরে কেমন যেন অস্বস্তি হইতে লাগিল। সুশীলের অনেক বান্ধবীকে দেখিয়াই তাঁহার এমন দেহচাঞ্চল্য ঘটিয়া থাকে, তবে আজ আর পারিলেন না। তাড়াতাড়ি শৌচাগারে যাইয়া মনে মনে বলিলেন, "আবার যদি বয়সটা ফিরে পাই তবে মনের সুখে ফূর্তি করতে পারি।" 

ইচ্ছাঠাকরুন সেই সময় ঘরের বাহির দিয়া যাইতেছিলেন। পূর্বের ঘটনাক্রম তাঁহার গোচরে আসিলে কি করিতেন বলা শক্ত। তবে মোবাইল ফোনের টাওয়ার হইতে নির্গত তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের প্রভাবে দেবতাদের চক্ষু-কর্ণের ব্যাপক ক্ষতি হইয়াছে। তিনি সুবলচন্দ্রের মনের কথাটিই খালি পড়িতে পারিলেন, কিন্তু "ফূর্তি"র সঠিক অর্থ তাঁহার বোধগম্য হইল না। সুবলচন্দ্রকে গিয়া বলিলেন, "তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হইবে। কাল হইতে তুমি তোমার ছেলের বয়স পাইবে।"

বয়স হইলেও সুবলচন্দ্রের রাত্রে ঘুম ভালোই হইত। কিন্তু আজ উত্তেজনায় তাঁহার চোখের পাতা এক হইল না। ভোরের দিকে একটু ঘুম আসিয়াছিল। সকালে জাগিয়াই এক লাফ দিয়া মেঝেতে পড়িলেন। দেখিলেন চুল সব কালো হইয়া গেছে, পাকা গোঁফদাড়ির জায়গায় সদ্য ওঠা কচি গোঁফদাড়ি দেখা দিয়ছে, পড়া দাঁত সবগুলি উঠিয়াছে। যে গেঞ্জিটি পরিয়াছিলেন তাহা ঢিলা হইয়া গেছে, পাজামার দড়ি খুলিয়াছে। তাঁহার শরীরের তাজা রক্ত চনমন করিয়া উঠিল। 

সেদিন দামিনী যখন ইস্কুল হইতে ফিরিতেছিল, সুবলচন্দ্র তাহার পথ আটকাইলেন। সুশীলের চেহারা ও কন্ঠস্বরের সহিত ছেলেবেলার সুবলচন্দ্রের বেশ সাদৃশ্য ছিল। পড়ন্ত আলোয় দামিনী সুবলচন্দ্রকে সুশীল বলিয়া ভুল করিল। আগেও কয়েকবার সে ইস্কুল ফেরৎ সুশীলের বাড়ি গিয়াছে। শর্টকার্ট দিয়া বাড়ি যাইবার ছল করিয়া সুবলচন্দ্র তাহাকে হরি ঘোষের গোয়ালের দিকে লইয়া যাইলেন। হরিঘোষের মৃত্যুর পর ছেলেরা এখন কলিকাতাবাসী, তাঁহার বসতবাটি ও বিশাল গোয়াল পরিত্যক্ত পোড়োবাড়ির দশা পাইয়াছে। ফলতঃ দামিনী যখন নিজের ভুল বুঝিতে পারিল তখন চিৎকার করিয়াও কোন লাভ হইল না।

পরদিন ভোররাতে যখন দামিনীর নিরাবরণ, অচেতন দেহ আবিষ্কৃত হইল, সুবলচন্দ্র ততক্ষণে ইচ্ছাঠাকরুনের সাহায্যে নিজের বয়সে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। দামিনীর মৃত্যুকালীন জবানবন্দী ও অন্যান্য সূত্রের মাধ্যমে কিভাবে সুবলচন্দ্র সনাক্ত হইলেন সে মহাভারত আর বর্ণনা করিলাম না, তবে দামিনীর যৌনাঙ্গের ভিতরে থাকা তাঁহার অতি পরিচিত টর্চটি এব্যাপারে বড় ভূমিকা পালন করিয়াছিল। এই ঘটনা লইয়া দেশজুড়ে শোরগোল পড়িয়া গেল। সংবাদমাধ্যম সরকারকে তুলোধোনা করিতে লাগিল, টেলিভিশনে ঘটনার কাল্পনিক নাট্যরূপ প্রদর্শিত হইল, বিরোধীদল দামিনীকে নিজেদের সমর্থক ও সুবলচন্দ্রকে শাসকদলের কর্মী বলিয়া আন্দোলন শুরু করিল, বিদ্বজনেরা সান্ধ্য বিতর্কে গলা ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন, নাগরিক সমাজ সুবলচন্দ্রের ফাঁসির দাবীতে রাস্তায় মোমবাতি মিছিল ও ফেসবুকে লাইকের ঝড় তুলিল। সন্ধ্যাবেলায় দামিনী বাড়ির বাইরে কি করিতেছিল তাহা লইয়া মুখ্যমন্ত্রী সংশয় ব্যক্ত করিলেন এবং এই সামাজিক অবক্ষয়ের পিছনে পূর্বতন সরকারের দায়টা নিঃসংশয়ে ঘোষণা করিলেন।

পুলিসে হেফাজতে থাকাকালীন সুবলচন্দ্র কোন মন্তব্য করেননি। অবশেষে আদালতে শুনানির সময় আস্তিন হইতে তুরুপের তাসটি বাহির হইল। তাঁর আইনজীবি দাবী করিলেন যে ঘটনার সময় সুবলচন্দ্রের বয়স ছিল মাত্র সতের বছর। সরকারি আইনজীবি তার সহকর্মীর মস্তিস্কের সুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করিলে তিনি ইচ্ছাঠাকরুনকে সাক্ষী মানিলেন। ইচ্ছাঠাকরুন ইতিমধ্যে নারদের নিকট সকলই আবগত হইয়াছেন। তিনি নিজের কৃতকর্মের জন্য মাথা ঠুকিতেছেন কি না তা অবশ্য জানা যায়নি।

একুশ শতকে দেবতাদের প্রতিপত্তি বলিতে আর কিছু অবশিষ্ট নাই। মানুষের আদালতের সমন তাঁহারা উপেক্ষা করিতে পারেন না। তাই ইচ্ছেঠাকরুন সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া বলিতে বাধ্য হইলেন যে ঘটনার দিন তাঁহার আশীর্বাদে সুবলচন্দ্র সপ্তদশ বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন কিন্তু এজন্য তাঁহার প্রাপ্য শাস্তিতে কোন ছাড় দেওয়া অনুচিৎ হইবে। সুবলচন্দ্রের আইনজীবি ধমক দিয়া বলিলেন, "আপনাকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়েছে, শাস্তি দেওয়া আদালতের দায়িত্ব।"

আদালত সংবিধানের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখিয়া সে দায়িত্ব পালন করিল। দামিনীকে ধর্ষণ ও নৃশংস ভাবে হত্যার জন্য সুবলচন্দ্র দোষী সাব্যাস্ত হইলেও নাবালক হিসেবে তাঁহাকে তিন বছরের জন্য জুভেনাইল হোমে রাখার নির্দেশ দেওয়া হইল। সুবলচন্দ্রের আইনজীবি বলিলেন, ঘটনার সময় নাবালক হইলেও এখন তাঁহার বয়স পঞ্চাশের অধিক। এই বয়সের কোন ব্যক্তিকে কিভাবে জুভেনাইল হোমে রাখা যায়! সবদিক বিবেচনা করিয়া বিচারক সুবলচন্দ্রকে মুক্তি দিলেন। সুবলচন্দ্রের আইনজীবি ফের আবেদন জানাইলেন, অর্বাচীন জনতা আইনের বিচার বুঝিবে না, তাহাদের ক্রোধ হইতে তাঁহার মক্কেলকে নিরাপত্তা দেওয়া হউক। আদালত তাঁহার আর্জি মঞ্জুর করিলেন। জেড প্লাস নিরাপত্তা বলয় লইয়া ঘরে ফিরিলেন সুবলচন্দ্র।

ঋণঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রথম প্রকাশঃ লেখালেখি ফেসবুক গ্রুপ

গদাইয়ের প্রতিশোধ

গদাই হচ্ছে এ পাড়ার সবচেয়ে ডানপিটে ছেলে। প্রায় প্রতিদিনই তার বাবার কাছে নানারকম নালিশ জমা পড়ে। কার জানলার কাঁচ ভেঙ্গেছে, কার ছেলেকে ধোলাই দিয়েছে, কার গাছ থেকে জামরুল চুরি করেছে, এই আর কি। আর স্কুলে! সেখানে তো সাতটা ক্লাসের মধ্যে চারতেতেই গদাইকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
সেদিন তো এক কাণ্ডই হয়ে গেল। গদাইয়ের অঙ্কের মাস্টারমশাই হচ্ছেন ছাত্রদের কাছে সাক্ষাৎ যম। তিনি যত না অঙ্ক ভালোবাসেন তার চেয়ে বেশী ভালোবাসেন পেটাতে।। এমন কি ক্লাস টুয়েলভের ছাত্ররাও তাঁরা হাত থেকে রেহাই পায় না। তার নাম গোবিন্দ চ্যাটার্জি হলেও গবু নামেই তিনি অধিক পরিচিত।
তা সেদিন গবু স্যারের কাছে গদাই বেধরক পেটানি খেল। সে এমন কিছু করেনি, খালি গণেশের সাদা জামাটা দেখতে বাজে লাগছিল বলে সেখানে পেন দিয়ে একটা হাতি এঁকে দিয়েছিল, কেষ্টর ব্যাগে দুটো জ্যান্ত আরশোলা ঢুকিয়ে দিয়েছিল আর গোবরের পেছনে একটা কাগজের ল্যাজ লাগিয়ে দিয়েছিল।
এই সামান্য কাজের জন্য তাকে পেটানোয় আর পরদিন বাবাকে ডেকে সব বলে দেওয়ায় গদাই ভারি অপমানিত বোধ করেছিল। তাছাড়া ওরাও তো গদাইএর চেয়ে ভালো কাজ কিছু করেনি! ক্লাস না করে মাঠে ফুটবল খেলছিল বলে গোবর যে স্যারকে বলে দিল? সংস্কৃত ক্লাসে ধাতুরূপ মুখস্থ বলে কেষ্ট যে গদাইকে কানমলা খাওয়াল? গদাই যে ধাতুরূপ পড়েনি তা কি ও জানত না! আর গনেশের জামায় ছবি আঁকায় তো সুন্দরই লাগছিল!
তবু কেন গদাইএর ওপর সব দোষ পড়ে? নাহ, এর একটা বিহিত না করলেই নয়। গবু স্যারের ওপরই প্রথম শোধটা নিতে হবে।
একবার সে সাইকেলের পাম্প খুলে রাখল। কিন্তু ওদের ক্লাসেরই এক বিশ্বাসঘাতক ছেলে দেখে ফেলল আর গদাই আগের বারের দ্বিগুন মার খেল হেডস্যারের কাছে। নাহ, এভাবে কিছু হবে না। অন্য ফন্দী আঁটতে হবে।

আজ সকাল থেকেই গোবিন্দবাবুর মেজাজটা বেশ ভালো ছিল। প্রথমতঃ বর্ধমান থেকে তাঁর ভাগনে এসেছিল। সঙ্গে বাক্সভর্তি সীতাভোগ-মিহিদানা। এদুটোই গোবিন্দবাবুর প্রিয় খাবার। তার ওপর পড়তে আসা চার-চারজন ছাত্রকে তিনি মনের সুখে ঠেঙাতে পেরেছেন। যেদিন তার মেজাজ ভালো থাকে সেদিন তিনি ছেলের মাথায় গাঁট্টা মারেন, মেয়ের কান মলে দেন আর বৌএর সঙ্গে ঝগড়া করেন। আজও তার ব্যতিক্রম হল না। ঝগড়া টগড়া করে, পাঁঠার মাঙ্গস দিয়ে ভাত খেয়ে পান চিবোতে চিবোতে বেরোতে যাচ্ছেন আর তক্ষুনি "ক্রিং ... ক্রিং...", ফোনটা বেজে উঠল-
"হ্যালো?"
"মিস্টার গোবিন্দ চ্যাটার্জি আছেন?"
"কথা বলছি"
"আমি টেলিফোন অফিস থেকে বলছি। আপনার প্রথম টেলিফোন বিলটা নিয়ে দুপুর আড়াইটের মধ্যে এখানে চলে আসুন। নয়ত টেলিফোনের লাইন তো কাটা যাবেই তার ওপর দশ হাজার টাকা জরিমানা হবে"
"কেন কেন? কি ব্যাপার? ... হ্যালো হ্যালো ..."
গোবিন্দবাবু টেলিফোন নিয়েছেন সাত বছর হল। সাত বছর আগের বিল খুঁজে পাওয়া কি সোজা কথা! কিন্তু খুঁজতে তো হবেই, নইলে দশ হাজার টাকা নিয়ে নেবে! চারতে প্রাণী মিলে বিসাল পৈতৃক বাড়িতে তন্ন তন্ন করে টেলিফোনের বিল খুঁজতে লাগলেন। কত কিছুই বেরোল, গোবিন্দবাবুর ফিফথ ক্লাস থেকে ফোর্থ ক্লাসে ওঠার রেজাল্ট, স্কুল পালিয়ে দেখা সিনেমার টিকিট, বাবা-মার বিয়ের কার্ড, পাঁচ বছর আগে হারানো গিন্নীর সোনার দুল, বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে মোট তেইশ টাকা পঁইয়ষট্টি পয়সা আর ... না থাক আর তালিকা বাড়িয়ে কাজ নেই।
শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত বস্তুটি পাওয়া গেল ২টো বেজে পঁচিশে। আবিষ্কারক গোবিন্দবাবুর মেয়ে।
তাঁর বাড়ি থেকে টেলিফোন অফিস যেতে পনের-কুড়ি মিনিট লাগে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঝড়ের বেগে আর ফিরে এলেন আধঘন্টার মধ্যেই।
এসে বোমার মতই ফেটে পড়লেন। "কোন শয়তান এটা করল আমি তাকে দেখে নেব ... ওখানে বলে কি না, 'কে আপনাকে ফোন করেছিল? স্বপ্ন দেখেছেন!' ... হুঁহঃ"
বাইরে তখন হাসিতে গরাগড়ি যাচ্ছে গদাই আর তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা।


হাত পাকাবার আসর, সন্দেশ (চৈত্র ১৪০৭) এ প্রকাশিত

Saturday, 28 April 2012

কাঁদরপাড়ি

সাইনবোর্ডটা না থাকলে বিশ্বাস করা মুশকিল হত যে এটা একটা স্টেশন। ফাঁকা মাঠের মধ্যে একটা কাঠের বেঞ্চ আর একটা সাইনবোর্ডে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজিতে লেখা আহমেদপুর। প্ল্যাটফর্ম বা টিকিটঘরের কোন চিহ্ন নেই। চারপাশে শুধু চাষের ক্ষেত, একটা মানুষ নেই যে জিজ্ঞাসা করব। অনেকটা দূরে কিছু টালির ঘর দেখা যাচ্ছে। আমরা নজন বাদে ট্রেন থেকে আর কেউ নামেনি। আমরা সবাই রমেশের মুখের দিকে তাকালাম।
রমেশ বলল, “ওরা তো বলেছিল স্টেশন থেকে নেমে কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে কোদারমা গ্রামটা কোনদিকে”।
“আরে লোক কোথায় যে বলব! এদিকে খিদেতে পেট চুঁইচুঁই করছে” রাগত স্বরে বলল গোবিন্দ। “সেকি রে বর্ধমানে দেড় কেজি মিহিদানা তো তুই একাই ... ”
পটল শেষ করার আগেই খিঁচিয়ে উঠল গোবিন্দ, “দেড় কেজি তে কি হয় রে শালা? আর তুই যেন কিছু খাসনি!”
অমল বাধা দিয়ে বলল “অ্যাই তোরা থামত, একবার পৌঁছাতে পারলে তো আর খাওয়া দাওয়া নিয়ে চিন্তা থাকবে না। কিভাবে যাওয়া যায় সেটা ভাব।”
এখানে বলে রাখি যে সময়ের কথা বলছি, তখন মোবাইল ফোন দূরের কথা, কারো বাড়িতে ল্যান্ডফোন থাকা মানে তাকে কেউকেটা বলে গণ্য করা হত। আমি দূরের বাড়িগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, “ওইদিকে গিয়েই খোঁজ করতে হবে মনে হচ্ছে।” রমেশ সেদিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই কেষ্ট চেঁচিয়ে উঠল, “ইউরেকা ইউরেকা”।
“তুই আবার কি পেলি?” বলে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি, একজন লোক, আলের ধারে বোধহয় বোধহয় প্রাকৃতিক কাজ সারছে। আমরা হই হই করে তার দিকে এগিয়ে যেতেই সে ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ালো।
“ও কাকা, কোদারমা গ্রামটা কোথায় বলতে পারো?” “কোদারমা? হুউউউই দিকে সোজা হাঁটতে থাকুন” বলে উত্তর-পশ্চিম দিকে হাত দেখালো। “তা কোথা থেকে আসা হচ্ছে বাবুদের?”
ভোঁদা তড়বড় করে বলে উঠল, “আমরা আসছি চন্দননগর থেকে, মেয়ে দেখতে যাবো কোদারমায়”।
লোকটা দাঁত বার করে বললো “তাই বুঝি? তা কার বাড়ি যাবেন?”
ভোঁদা কিছু বলার আগেই রমেশ তার পেটে একটা রামচিমটি দিয়ে বললো, “সেসব ওখানে গিয়ে ঠিক করবো, এই তোরা চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা দাদা অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।” লোকটার হাঁ হয়ে যাওয়া মুখের সামনে দিয়ে আমরা পা চালিয়ে এগিয়ে গেলাম।

আমরা সবাই ছোটবেলার বন্ধু, বুঝতেই পারছেন, একসাথে খেলেছি, বিড়ি খেয়েছি, লোকের বাগান লুঠ করেছি, অন্য পাড়ায় খেলতে গিয়ে মারপিট করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের মধ্যে রমেশ সবে রেলে একটা চাকরি পেয়েছে আর অমল স্কুলে পড়ায়। বাকিরা সবাই বলতে গেলে যার যার বাপের হোটেলের নিয়মিত খদ্দের। আর বলাই বাহুল্য সবাই ব্যাচেলর। রমেশ প্রথম দলত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার জন্যই আজ আমাদের অভিযান। ওর বাবা আর জ্যাঠা পাত্রী দেখে পছন্দ করে এসেছেন। কিন্তু তাতে কি, আমরা দেখবনা আর রমেশের বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে তা তো হতে পারেনা!

“এই রে এবার কি হবে?” পটলের কথা শুনে সামনে তাকিয়ে দেখি সামনে একটা কাঁদর। কাঁদর একধরণের ছোট নদীর মত। দুটো ঢাল দুদিক থেকে এসে মিশলে মাঝখানে একটা খাদের সৃষ্টি হয়। সেখানে জল জমে তৈরি হয় কাঁদর। জল বেশি না থাকলে হেঁটেই পার হওয়া যায়, নয়তো ভেলা বা ছোট নৌকা-র দারকার হয়। আমাদের সামনের কাঁদরটায় ভালোই জল রয়েছে, হেঁটে যাওয়া যাবেনা, আর একটা ডিঙি রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা ওপারে বাঁধা। আর কোন লোকজনও দেখা যাচ্ছে না। সাঁতরে পার হওয়া যায়, কিন্তু রমেশের হবু শ্মশুরবাড়ি যাচ্ছি, সবাই বেশ ভালো জামাকাপড় পরেই এসেছি। আর উপায়ও তো দেখছি না। শেষ পর্যন্ত সবাই ধরাচুড়ো ছেড়ে, কেষ্ট আর যতীন সঙ্গে দুটো গামছা এনেছিলো সেই দুটো পরে দুজন দুজন করে পার হলাম।
ওপারে গিয়ে জামাকাপড় পড়তে যাবো, এমন সময় রমেশ বললো “এগুলো কি আর এখন পরার দরকার আছে?” গোবিন্দ চোখ তুলে বললো, “মানে? তোর শ্বশুরবাড়ি, তুই যদি আন্ডারওয়ার পরে যেতে চাস, আমাদের কিছু বলার নেই, তবে আমরা পারবনা, সরি”। “আরে বাবা আমি কি তাই বলেছি না কি? রাস্তায় আরো কতগুলো কাঁদর পড়বে কে জানে, তাই বলছিলাম একেবারে গ্রামের কাছাকাছি গিয়ে পরলেই তো হয়” অমল গম্ভীরভাবে বলল, “হুম, এটা ঠিক কথা।” 
সুতরাং আমরা জামাকাপড়গুলো পোঁটলার মতো করে পিঠে ঝুলিয়ে নিলাম। তারপর ওই অবস্থায় সারি বেঁধে এগিয়ে চললাম। আরো দুটো কাঁদর সাঁতার কেটে পার হতে হল। আমাদের দেখে লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আমরা জোরে পা চালাচ্ছিলাম, যাতে অতিরিক্ত কোউতূহলের মুখোমুখি হতে না হয়। তবু একজন জিগ্যেস করে বসল, “কোথায় যাচ্ছেন দাদা?” কেষ্ট উত্তর দিলো, “ফুটবল ম্যাচ আছে, দেখতে যাবেন” “ফুটবল! কোথায় ...” ততক্ষণে আমরা অনেকটা এগিয়ে গেছি, তাই জবাব দেওয়ার দরকার হলনা। এভাবে প্রায় ঘন্টা দেড়েক হাঁটার পর, পটল চেঁচিয়ে উঠল, “ওই দেখ” 
এবার আমরা সকলেই দেখতে পেলাম, একটা ছোট একতলা পাকাবাড়ির সামনে লেখা, “কোদারমা ১ নং গ্রাম পঞ্চায়েত”। এতক্ষণে দেখা গেল রমেশের মুখে একটা লজ্জা ভাব চলে এসেছে। আমরা তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পরে নিলাম, এবার তিন কাঁদর পাড়ি দিয়ে যে রাজকন্যার সন্ধানে এসেছি তাকে দেখার পালা।


ঋণঃ সিমলের দাদু
প্রথম প্রকাশঃ পাঠাগার ব্লগ