Thursday, 28 September 2017

কাকাবাবু, সাবা কাব্বানি আর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ

কেমন আছেন কাকাবাবু? সন্তু, জোজো, দেবলীনা, ওরা সবাই ভালো আছে? এবারই প্রথম পুজোয় আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না।
নতুন কোন অভিযানে যাচ্ছেন না কি? গেলেও আমরা তো আর জানতে পারব না। তাই পুরনো কথাগুলো ভাবছিলাম।  আচ্ছা আপনার সাবা কাব্বানির কথা মনে আছে? আপনি আর সন্তু যখন ক্রাক দ্য শ্যাটেলিয়র দুর্গে বন্দি ছিলেন, তখন কাব্বানি আপনাদের পাহারা দিত। আপনি বলেছিলেন জেলখানার পাহারাদারের এমন ব্যবহার কোন গল্পের বইয়েও দেখা যায়না। তার ছেলে যখন মারা যায় সে ছিল সন্তুরই বয়সী। প্রচণ্ড শীতে সন্তুকে কাঁপতে দেখে সে ছেলের একটা কোট এনে জোর করে পরিয়ে দিয়েছিল। তার একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল, "সিরিয়া দেশটা বেশ শান্তিপূর্ণ, যুদ্ধটুদ্ধ হয়না। তবে মানুষই তো মানুষের শত্রু।" কিম্বা বাঙালি ব্যবাসায়ী প্রোজ্জ্বল রায়? সেও তো বলেছিল "এ দেশের মানুষগুলো সত্যি ভালো। পাশের দেষগুলোতে কত যুদ্ধবিগ্রহ আর মারামারি চলছে। এ দেশটা কিন্তু শান্তিপুর্ণ। আপনাদের ভালো লাগবে।" বেশিদিন নয়, আমি এই বছর তিনেক আগের কথা বলছি। আপনারা যেবার ধনকুবের আবু-আল-ফিদা সালাদিনের আমন্ত্রণে সিরিয়া তারতুফ শহরে গিয়েছিলেন।[১] এখন নিশ্চয়ই ওই কথাগুলো এক একটা নির্মম রসিকতা বলে মনে হয় আপনার? আপনারা ফিরে আসার এক বছরও কাটেনি, ওই দেশে যে অশান্তি শুরু হল তা এখনো থামার তো কোন লক্ষণই নেই বরং তার ভয়াবহতা রোজই বেড়ে চলেছে। ইতিমধ্যেই লক্ষাধিক মানুষ মারা গেছেন, কুড়ি লাখ মানুষ, সীমানা পেরিয়ে আশেপাশের দেশগুলোর উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ষাট লাখ মানুষ অর্থাৎ সিরিয়ার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ ঘরছাড়া।[২] 

এগুলো অবশ্য নেহাতই স্ট্যাটিস্টিক্স। একটা লেভেলের পর তো আর সংখ্যার কোন অর্থ হয় না। কাকাবাবু আপনি নিশ্চয়ই গত ২১শে আগষ্ট খবরের কাগজে দেখেছেন, সেই সারি দিয়ে শুয়ে থাকা বাচ্ছাগুলোর ছবি? ঘুমের মধ্যেই তাদের ঘরে হানা দেয় বর্ণহীন, গন্ধহীন সারিন গ্যাস। ছটফট করতে করতে দমবন্ধ হয়ে তারা মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে।[৩] ঐ ছবিগুলো দেখতে দেখতে আপনার কি রবের কথা মনে পড়ছিল? সেই ফুটফুটে বাচ্ছাটা, যে আপনাকে আর সন্তুকে কমলালেবু দিয়েছিল? আপনি শিখিয়ে দেওয়ার পর সুন্দর উচ্চারণে ন-ম-স-কা-র বলে হাত নেড়েছিল? তার মায়ের নাম ছিল জেনোবিয়া। আপনি যখন বললেন জেনোবিয়া নামে সিরিয়ার এক রাণী ছিলেন, যিনি রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, তখন ভদ্রমহিলা বেশ অবাক হয়ে বলেছিলেন, "আপনি আমাদের দেশের ইতিহাস জানেন দেখছি! আপনি কি অধ্যাপক?" আসুন ছোট্ট করে একবার এই দেশটার ইতিহাসে চোখ বুলিয়ে নিই।

পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা যেখানে গড়ে উঠেছিল সেই উর্বর হাঁসুলির (Fertile Crescent) অন্তর্ভূক্ত ছিল আজকের সিরিয়া।
পশ্চিমে মিশর থেকে শুরু করে, ভূমধ্যসাগরকে ঘিরে, সিরিয়া, প্যালেস্তাইন, লেবানন হয়ে ইরান, তুরস্কের খানিকটা অংশ আর পূর্বদিকে ইরাক, ম্যাপের দিকে তাকালে দেখা যাবে এই অঞ্চলটার চেহারা অনেকটা হাঁসুলি বা কাস্তের মত। টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস আর নীলনদের জলে উর্বর মাটি এই হাঁসুলিতে সভ্যতা পত্তনের অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল। যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় দশহাজার বছর আগের মনুষের বসতির প্রমাণ পাওয়া গেছে এখানে। চাকার ব্যবহার, নব্য প্রস্তরযুগে চাষবাস ও পশুপালন এমনকি বর্ণমালার উদ্ভবও হয়েছিল সিরিয়ায়। নীলনদের দান মিশর আর টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিসের মাঝে মেসোপটেমিয়া (ইরাক), দুই বিখ্যাত প্রাচীন সভ্যতার সেতু ছিল সিরিয়া। হাজার হাজার বছর ধরে দুই সভ্যতার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প সংস্কৃতির আদান প্রদান সমৃদ্ধ করেছে সিরিয়াকে। দলে দলে এসেছে মেসোপটেমিয়া থেকে সুমেরীয়, আসারীয়, আক্কাদরা, মিশর থেকে মিশরীয়রা, এশিয়া মাইনর থেকে হিটাইটরা। ঠিক আমাদের দেশের মতই "দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হল হারা"।[৪,৫] 

ভারতবর্ষের মতই সিরিয়াকেও বারবার বহিরাগতদের হাতে আক্রান্ত হতে হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পারস্য সাম্রাজ্য, আলেক্সান্ডারের গ্রীক সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য, ইসলামিক আরব সাম্রাজ্য ও অটমান তুর্কি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সিরিয়া। আরব মুসলমানদের অধিকারের সময় থেকেই আরবি সিরিয়ার প্রধান ভাষা হয়ে ওঠে। পশ্চিমে স্পেন থেকে পূর্বে ভারতবর্ষের সীমান্তে হিন্দুকুশ পর্বতমালা, বিশাল ইসলামিক সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে দামাস্কাস নগরীর রমরমা বেড়ে যায়। খ্রিস্টধর্মের সঙ্গেও সিরিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত পুরনো। সেন্ট পল নাকি দামাস্কাসের পথে যিশুখ্রিস্টের দেখা পেয়ে ইহুদি মতবাদ ত্যাগ করে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং দামাস্কাস থেকেই তাঁর নতুন ধর্মপ্রচারের কাজ শুরু করেন। নানা জাতিধর্মের সমাহার ঘটলেও আরব সুন্নীরাই ক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠল। তবে তারা শিয়া, ইহুদী, মেরোনাইট ও আর্মেনীয় খ্রিস্টানদের সঙ্গে মোটামুটি শান্তিতেই সহাবস্থান করত।[৬] 

সালাদিন আপনাকে সম্ভবত ভেড়ার চামড়ার ওপর লেখা কয়েকটা নথি দিয়েছিলেন। আরামাইক ভাষায় লেখা ঐ নথিগুলোতে স্বয়ং যিশুখ্রিস্টের হাতের লেখা ছিল বলে সালাদিন অনুমান। প্রায় তিনহাজার বছরের পুরনো এই আরামাইক ভাষাতেই নাকি যিশু কথা বলতেন। দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে এই ভাষা নানা উপভাষায় ভেঙ্গে গেছে। এখনও খ্রিস্টান ও ইহুদী ধর্মাবলম্বী পশ্চিম এশিয়ার অনেক বিচ্ছিন্ন জনজাতি এইসমস্ত উপভাষায় কথা বললেও আরামাইক ভাষাকে বিপন্ন বলেই ধরা হয়। ঐ নথির পাঠোদ্ধার করার আশায় আপনারা মম আলুলা গ্রামে গেলেন। দামাস্কাস থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের খাঁজে গড়ে ওঠা এই গ্রামটির বৈশিষ্ট হল এখানকার হাজার দুয়েক অধিবাসী সকলেই পশ্চিমী আরামাইক ভাষায় কথা বলেন।[৭] এত জায়গা থাকতে এরা পাহাড়ের মধ্যে থাকে কেন এ ব্যাপারে সন্তু কৌতূহল  প্রকাশ করতে আপনি বললেন, "একসময় খ্রিস্টানরা ইহুদি আর রোমানদের ভয়ে পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াত, লুকিয়ে থাকত। সেই রকমই একটা গোষ্ঠী এই পাহাড়ের গুহাগুলোয় আশ্রয় নিয়েছিল। এরা তাদেরই বংশধর। এখনও সেই সময়ের ভাষা বলে। তবে এখন নিশ্চয়ই এদের অনেকে চাকরিবাকরি করে। অন্য ভাষাও শিখেছে, তবু নিজেদের পুরনো ধারাটা বজায় রেখেছে"। ভাগ্যিস রেখেছিল, তাই চলতি সংঘর্ষের আঁচ থেকে এরা অনেকদিন অবধি নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে সিরিয়ার ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রতীক মম্ আলুলা আজ অস্তিত্বের সঙ্কটে। কদিন আগেই আল কায়দার উগ্রপন্থীরা ৮ জন নিরাপত্তারক্ষীকে খুন করে গ্রামটি দখল করে। পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে সরকারি বাহিনীও।[৮]  আরামাইক ভাষা আর কদিন টিকে থাকবে বলা যাচ্ছেনা, কাকাবাবু। ভাগ্যিস সালাদিন ঐ দলিলটা আপনাকে দিয়ে দিয়েছিলেন, নাহলে এই অশান্তির মধ্যে ওটার কথা আর কে মাথায় রাখত!

শুধু মম্ আলুলা নয়, আড়াই বছরের গৃহযুদ্ধের শিকার হয়েছে প্রাচীন সভ্যতার বহু ঐতিহ্য। আল কাশিম ওরফে ইব্রাহিম আপনাদের যে ক্রাক দ্য শ্যাটেলিয়র দুর্গে আটকে রেখেছিল, সেটা তৈরী করেছিল কুর্দরা, একাদশ শতাব্দীতে। পরে তা ক্রুসেডারদের হাতে যায়। ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী এই কেল্লার একটা টাওয়ার ভেঙে পড়েছে সেনাবাহিনীর বিমান হানায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সৈদনেয়ার কনভেন্ট অফ আওয়ার লেডি চার্চ, আলেপ্পোর বিরাট মসজিদ, বিখ্যাত আল মানার বাজার, প্রাচীন আসিরীয় মন্দির ও আরো অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। হজরত মহম্মদের বিশ্বস্ত সঙ্গী হিজির আল কিন্দীর সমাধিও রেহাই পায়নি ইসলামের ধ্বজাধারী বিদ্রোহীদের হাত থেকে।[৯]

যাকে সিরিয়া বলছি সেই অঞ্চলের মধ্যে আজকের প্যালেস্তাইন, জর্ডন, লেবানন, এবং ইরাক ও তুরস্কের খানিকটা অংশও পড়ছে। আধুনিক সিরিয়ার পত্তন বলা যেতে পারে ফরাসী ম্যানডেটের মাধ্যমে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বৃটিশ ও ফরাসীরা আরবভূমিকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। ইরাক, প্যালেস্তাইন, জর্ডন বৃটিশরা দখলে নেয় আর ফরাসীদের ভাগে পড়ে সিরিয়া, লেবানন।[৬] দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে সিরিয়া স্বাধীন হয়। ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় ও তা শেষ হওয়ার পরেও পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা, যাকে মধ্যপ্রাচ্য বলা হয়, বিশ্বরাজনীতির নানা তৎপরতার সাক্ষী।  মিশরের আরব জাতীয়তাবাদী নায়ক আবদুল গামাল নাসেরের ডাকে সাড়া দিয়ে সিরিয়া মিশরের সঙ্গে জোট বেঁধে সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলে, কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যেই আবার দুই দেশ  পৃথক হয়ে যায়। এদিকে তেলসমৃদ্ধ এবং রণনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ছড়ি ঘোরানোর জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা চলে যাওয়ার আগে প্যালেস্তাইনের মাটিতে ইজরায়েল নামে ইহুদীদের জন্য একটা রাষ্ট্র খাড়া করে গেল। প্রসঙ্গতঃ ইহুদীরা ঐ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই ছিল, আরবদের সঙ্গেই। তার ওপর হিটলারের উত্থানের পর ইউরোপ থেকে বিতাড়িত হয়ে ইহুদীরা দলে দলে চলে এলেন প্যালেস্তাইনে। তাঁদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের হয়ত প্রয়োজন ছিল, কিন্তু প্যালেস্তাইনের মধ্যে ইজরায়েলের প্রতিষ্ঠায় মধ্যপ্রাচ্যে যে সঙ্ঘাতের সূত্রপাত হল তা মেটার কোন সম্ভাবনা আজও দেখা যাচ্ছেনা। পশ্চিমীদের সমর্থনপুষ্ট ও উচ্চ সামরিক ক্ষমতার অধিকারী ইজরায়েল ছুতোনাতায় আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে নিজের জমি বাড়িয়ে নিয়েছে। নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকছেন প্যালেস্তিনীয়রা। 

১৯৪৭ সালে সিরিয়ায় মাইকেল আফলাকের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় আরব স্যোসালিস্ট বাথ পার্টি। আরব জাতীয়তাবাদ ও সমাজবাদী আদর্শ নিয়ে এবং অনেকটা লেনিনীয় গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার কাঠামো নিয়ে বাথ পার্টি দ্রুত ইরাক, লেবানন, জর্ডন, সুদান ইত্যাদি দেশে সংগঠন বিস্তৃত করে। ১৯৬৩তে বাথ পার্টি সিরিয়ায় ক্ষমতা দখল করল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্যে প্রেসিডেন্ট জাহিদ সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে দেশ গড়তে উদ্যোগী হলেন। কিন্তু ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে গোলান হাইট খোয়ানোর পর বাথ পার্টির আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব চরমে উঠল। অবশেষে আবার একটা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাফেজ আল আসাদ পার্টি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করলেন। ১৯৭২ সালে গণভোটে আসাদ সাত বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি হন। পরের বছর সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সিরিয়া নতুন সংবিধান গ্রহণ করে। সিরিয়াকে মুসলিম জনবহুল ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষনা করা হয়। কয়েকটা কমিউনিস্ট, বামপন্থী এবং জাতীয়তাবাদী দল ও সংগঠন কে নিয়ে বাথ পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠে জাতীয় দেশপ্রেমিক মোর্চা। এই মোর্চাই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।[১০] 

সিরিয়ার পাশাপাশি ইরাকেও বাথ পার্টি ক্ষমতা দখল করে, কিন্তু ভাগাভাগির চিরাচরিত নিয়ম মেনে বাথ আন্দোলন সিরিয়া ও ইরাকপন্থী অংশে ভেঙ্গে যায়। দুই গোষ্ঠির তিক্ততা এমন চরমে ওঠে যে ইরাক ইরান যুদ্ধ ও উপসাগরীয় যুদ্ধে সিরিয়া ইরাকের বিপক্ষে যোগ দেয়। ২০০৩ এ ইরাকে মার্কিন আক্রমণ ও ফাঁসির নামে সাদ্দাম হোসেনকে হত্যার বিরোধিতা অবশ্য সিরিয়া করেছিল।
প্রেসিডেন্ট আসাদ ছিলেন আলাওইট সম্প্রদায়ভুক্ত, যা আসলে শিয়া ইসলামেরই একটা শাখা, অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ সুন্নী মুসলমান। তাই একটা দ্বন্দ্ব ছিলই, কিন্তু ইসলামিক সাম্রাজ্য ও অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য মেনে সিরিয়ার শাসকগোষ্ঠী সুন্নী আরব, আলাওইট, খ্রিস্টান, কুর্দ সকলকে নিয়েই সহিষ্ণুতার বাতাবরণ বজায় রেখেছিলেন। আটের দশকের প্রথমদিকে মৌলবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুসলিম ব্রাদারহুড হোমস, হামা ও আলেপ্পো শহরে হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু করে। সেনাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে দশ থেকে পঁচিশ হাজার মানুষ নিহত হন। এর পর রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়। বাথ পার্টির ক্ষমতা দখলের সময় থেকেই সিরিয়ায় জরুরী অবস্থা বলবৎ ছিল।[১১]

হাফেজ আল আসাদ তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে বড়ছেলে বাসেলকে ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি পথদুর্ঘটনায় নিহত হলে ছোট ছেলে বাসারের ভাগ্য খুলে গেল। বাবার ডাকে স্নাতকোত্তর পাঠ অসমাপ্ত রেখেই তিনি তরিঘড়ি দেশে ফিরলেন। আপনি কি এর সঙ্গে অন্য কোন ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন? ঠিক ধরেছেন, সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যু না হলে তো রাজীবের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ত না! কে বলতে পারে, তাহলে হয়ত আজ বরুণ গান্ধীকেই নরেন্দ্র মোদীর উল্টোদিকে দেখা যেত! 

২০০০ সালে বাসার আল আসাদ হাফেজের মৃত্যুর পর মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হলেন বাসার আল আসাদ।
পেশায় সামরিক চক্ষু চিকিৎসক, বিলেতফেরত তরুণ প্রেসিডেন্টকে ঘিরে সিরিয়াবাসীর মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হল।  ২০০৭ এর গণভোটে ৯৭% ভোট পেয়ে আসাদ বিপুলভাবে জয়ী হলেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যাশা পূর্ণ হল না। ওপর ওপর কিছু সংস্কার হলেও জরুরী অবস্থার প্রত্যাহার, গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রসার বা বহুদলীয় নির্বাচনের কোন প্রক্রিয়াই শুরু হল না। তার সঙ্গে দুর্নীতি ও আসাদ পরিবারের স্বজনপোষণ তো ছিলই। সোভিয়েতের পতনের পর সিরিয়ার অর্থনীতিতে ধাক্কা আসে। সমাজবাদী পথ ছেড়ে মুক্ত অর্থনীতি বেছে নেওয়ার অবধারিত ফল হিসেবে আয়বৈষম্য বাড়তে লাগল। বহুদিন ধরে বজায় রাখা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও টাল খেল। বিশেষ করে আরব ও কুর্দ সুন্নীরা নিজেদের বঞ্চিত ও শোষিত মনে করতে লাগলেন।[১২]

আপনারা সিরিয়া থেকে ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই তিউনিশিয়া ও মিশরে স্বৈরতন্ত্র বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হল এবং দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল গোটা আরব দুনিয়ায়, যাকে সাধারণভাবে আরব বসন্ত বলা হয়ে থাকে। ২০১১ সালের ১৫ই মার্চ সিরিয়ার দারা শহরে রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, জলসংকট নিরসন ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবীতে বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হল। ক্রমশ এই আন্দোলন দেশের অন্যত্র প্রসার পেল এবং আর সব দাবীকে পিছনে ফেলে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবীটাই মুখ্য হয়ে উঠল। গঠিত হল ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেশন কমিটি ফর ডেমোক্রাটিক চেঞ্জ। প্রথমদিকে দমন পীড়নের রাস্তা ধরলেও অচিরেই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝল সরকার। ২৬শে মার্চ ২০০ জন বন্দী মুক্তি পেল। ২১শে এপ্রিল জরুরী অবস্থা উঠে গেল, শান্তিপুর্ণ রাজনৈতিক কার্যক্রমের অধিকার স্বীকৃত হল। এক বছরের মধ্যে বহুদলীয় নির্বাচনের সংস্থান রেখে নতুন সংবিধান রচিত হল। তুমুল অশান্তির মধ্যেই ভোট হল এবং সংসদের ৬০% শতাংশ আসনে জিতল বাথ পার্টি। অবশ্য বিদ্রোহীরা এই ভোট বয়কট করেছিল।[১৩]

কিন্তু এরমধ্যে ছবিটা বদলে গেছে। একইসঙ্গে মৌলবাদী সন্ত্রাস ও জায়নবাদী আগ্রাসনের প্রতিরোধ করে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার পতাকা তুলে ধরে সিরিয়া নিজেকে আঞ্চলিক ও বহুজাতিক কায়েমী স্বার্থগুলোর শত্রু করে তুলেছিল। আলেপ্পোয় ফ্রি সিরিয়ান আর্মির ঘঁটি তারা এ সুযোগ ছাড়তে চাইবে কেন? তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইন্ধন যোগাতে শুরু করল অশান্তিতে। সিরিয়ার সেনাবাহিনী থেকে একদল অফিসার ও সেনা বেরিয়ে গিয়ে তৈরী করল ফ্রি সিরিয়ান আর্মি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নাশকতা, সরকারি দপ্তর, স্কুল, হাসপাতাল, জনপদের ওপর হামলা চালিয়ে দেশের বেশ কিছু এলাকা দখল করল তারা। দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র আলেপ্পো সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। পাল্টা আক্রমণে গেল সিরিয়ার নিরাপত্তাবাহিনী। সরকারের হয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ল অনেক আঞ্চলিক মিলিশিয়াও। ইজয়ায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে সংগ্রামরত লেবাননের হেজবোল্লা এবং প্যালেস্তাইনের পপুলার ফ্রন্টও সিরিয়া সরকারের পাশে দাঁড়াল। দুপক্ষের গোলাগুলিতে দুর্বিষহ হয়ে পড়ল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর। ২০১২-র গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত হল আল নুসরা ফ্রন্ট। আল কায়দার এই শাখা গোষ্ঠীটি আপাতত আসাদের বিরুদ্ধে লড়লেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সিরিয়ায় শরিয়তি কানুন ও কট্টর সুন্নী ওয়াহাবী শাসন কায়েম করা। সরকারি বাহিনী ও বাথ পার্টির সমর্থকদের পাশাপাশি তাদের লক্ষ্য হয়ে উঠল দেশের খ্রিস্টান ও আলাওইট অধিবাসীরা। গণতন্ত্রের দাবীতে যাঁরা আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁরা হারিয়ে গেলেন, অনেকে খুন হলেন উগ্রপন্থীদের হাতে।

কাকাবাবু, আপনার সঙ্গে তো হানি আলকাদির আলাপ হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ভক্ত এই বিপ্লবীটি আপনাকে বলেছিল, "যারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে জানেনা তারা কী করে বিপ্লবী হবে?"[১৪] আপনি যদি সিরিয়ার "বিদ্রোহীদের" হানি আলকাদির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে থাকেন তবে আপনাকে মহম্মদ তাতার কথা বলি শুনুন। গৃহযুদ্ধের ধাক্কায় ১৪ বছরের এই ছেলেটার আর পড়াশোনা এগোয়নি। সে আলেপ্পো শহরে একটা চায়ের দোকান চালাত। এক সকালে একজন খদ্দের তাকে ফ্রিতে এককাপ চা খাওয়াতে বললে সে বলে "স্বয়ং নবী এলেও বিনা পয়সায় চা দেবনা।" কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল সশস্ত্র লোক এসে তাকে তুলে নিয়ে যায় এবং "নবীকে অবমাননা"র অপরাধে অভিযুক্ত করে গুলি করে মারে। এরা সকলেই ছিল ইসলামের স্বঘোষিত রক্ষক নুসরা ফ্রন্টের ক্যাডার এবং আলেপ্পো তখন বিদ্রোহীদেরই দখলে ছিল।[১৫] আপনি যদি মনে করেন এরকম কিছু উগ্রপন্থী থাকলেও বিদ্রোহীদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ অংশও আছে, তাহলে এই ভিডিওটা দেখুন,  http://www.youtube.com/watch?v=qxb8OFbwMQQ । এখানে দেখা যাচ্ছে ফ্রি সিরিয়ান আর্মির যোদ্ধা আবু সকর একজন সিরিয়ান সেনার পেট তার হৃৎপিণ্ড বের করে কামড় দিচ্ছে। পরে বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সে বলে, শত্রুদের সন্ত্রস্ত করতেই তার এই কাজ এবং আমেরিকা শিগগির অস্ত্রশস্ত্র না পাঠালে সে এরকম কাণ্ড আরো করবে। সে এটাও উল্লেখ করতে ভোলেনা যে ঐ সেনা ছিল আলাওইট এবং তাদের মতে আলাওইটরা ঠিকঠাক মুসলমান নয়।[১৬] আল নুসরা এবং ফ্রি সিরিয়ান আর্মি উভয়েই বর্বরতা, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত। যুদ্ধবন্দী সেনা, সাংবাদিক, ধর্মযাজক, ইমাম, বুদ্ধিজীবি ও অজস্র সাধারণ মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। একথা বলার অর্থ অবশ্য সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে সার্টিফিকেট দেওয়া নয়। তারাও বিদ্রোহীদের দমন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে মেরেছে।[২]

কাকাবাবু, আপনি জানেন আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত প্রভাবকে খর্ব করার জন্য আল কায়দা ও তালিবানকে তৈরী করেছিল আমেরিকাই।[১৭] সোভিয়েতের পতন হলে দুপক্ষের স্বার্থের সঙ্ঘাত তীব্র হয়। তারপর এল ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ। কিন্তু ২০১১-র লিবিয়া ও সিরিয়া দেখিয়ে দিল তারা এখনও কমরেড ইন আর্মস। লিবিয়াতেও একই কৌশল, প্রথমে জেহাদিদের হাতে অস্ত্র দিয়ে লেলিয়ে দাও, তারপর সরকার প্রত্যাঘাত করলে "গণতন্ত্র বিপন্ন" ছুতো দেখিয়ে সরাসরি আগ্রাসন চালাও। রাশিয়া-চীন নিস্ক্রিয় থাকায় লিবিয়ায় তাদের কৌশল সফল হল। ভোটের মুখে গদ্দাফির সঙ্গে তাঁর গোপন আঁতাত ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট সারকোজি গুপ্তচর পাঠিয়ে খুন করলেন গদ্দাফিকে।[১৮] তবে পাপ যে তার বাপকেও ছাড়েনা তা আবার প্রমাণ হল যখন "মুক্ত" লিবিয়ায় আল কায়দার জঙ্গিদের হাতে নিজের দপ্তরেই খুন হলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।[১৯]

বিদেশী যোদ্ধাদের সিরিয়ায় ক্রমবর্ধমান তৎপরতা সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদীদের মুক্তাঞ্চল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরাক, জর্ডন, মিশর এমনকি তাজিকিস্তান, চেচানিয়া থেকেও ওয়াহাবি জঙ্গিরা সিরিয়ার বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে।[২০] পাকিস্তান থেকে তালিবানদের একটা দলও সিরিয়ায় গেছে আসাদ হঠানোর লক্ষ্যে।[২১] আমেরিকা আল নুসরাকে সন্ত্রাসবাদী তালিকাভুক্ত করলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোন ব্যবস্থা তো নেয়ইনি, বরং জর্ডন ও তুরস্কের মাটিতে ঘাঁটি গেড়ে সিআইএ অফিসাররা নুসরা সমেত সব ধরনের বিদ্রোহীদেরই প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছে।[২২] সিরিয়া সরকারের অভিযোগ অনুযায়ী অস্ত্রও সরবরাহ করছে। দামাস্কাসে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট ফোর্ড বিদ্রোহীদের সংঘটিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
কাকাবাবু, আপনি নিশ্চয়ই সিরিয়াকে নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যাথায় অবাক হচ্ছেন, কারণ সিরিয়া অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল একটা দেশ, তাদের তেলসম্পদও খুব বেশী নয়। আসলে যত ছোটই হোক, লেবাননের গৃহযুদ্ধ থামিয়ে, প্যালেস্তাইনের মুক্তিসংগ্রামে সবরকমভাবে পাশে দাঁড়িয়ে সিরিয়া আরব দুনিয়ায় সমীহ আদায় করে নিয়েছে এবং আমেরিকা-ইজরায়েলের সাম্রাজ্যবাদী দখলদারির সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। তাছাড়া ইসলামি বিপ্লবের সময় থেকেই ইরান আমেরিকার ঘোরতর শত্রু, বুশ কথিত শয়তানের অক্ষের অন্তর্ভূক্ত। ইজরায়েলের সামরিক শক্তির সঙ্গে টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র ইরানেরই আছে। তাই ইরানকে সমঝে দেওয়াও একটা উদ্দেশ্য।[২৩] 

এবছরের মে মাস থেকে থেকেই ছবিটা ঘুরতে শুরু করে। এফএসএ জঙ্গিরা লেবাননে শিয়া বসতির ওপর হামলা চালালে হেজবোল্লা তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়। হেজবোল্লা ও সরকারি সেনা যৌথ আক্রমণ চালিয়ে আল কোয়াসার শহরটি পুনরুদ্ধার করে।[২৪] শহরটি রণনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারের কাছে কোয়াসার যেমন দামাস্কাস ও হোমস শহরের সংযোগ রক্ষা করছে তেমনি বিদ্রোহীদের কাছে এটা ছিল লেবানন হয়ে অস্ত্রপাচারের পথ। এর পর আরো কয়েকটা জায়গায় সাফল্য পায় সরকারি সেনা, এফএসএ ও নুসরা পিছু হঠতে থাকে। তার সঙ্গে বিদ্রোহীদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। ফ্রি সিরিয়ান আর্মির কমান্ডার আবু বসির আল লকদানি খুন হলেন আল কায়দা জঙ্গিদের হাতে।[২৫] কুর্দিশ বিদ্রোহীরা প্রথমদিকে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও পরে তারা ঘোষণা করে গৃহযুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন কুর্দরা সিরিয়ার ভেতরেই স্বশাসিত প্রদেশ গঠন করবে।[২৬] এটা মেনে নিতে না পেরে নুসরা ও ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড লেভেন্ট কুর্দিশদের ওপর হামলা চালায়।[২৭]

২১শে আগষ্ট দামাস্কাসের উপকন্ঠে ঘুটা শহরে রাসায়নিক অস্ত্রের আক্রমণে হাজারের বেশী মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে বেশীরভাগই শিশু।[২৮] এটা ঘটেছে এমন একটা সময় যখন রাষ্ট্রসঙ্ঘের পর্যবেক্ষকরা আগের একটা রাসায়নিক হামলার তদন্তে সিরিয়ায় ছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সিরিয়া সরকার পর্যবেক্ষকদের ঘুটায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেয়। কাকাবাবু, আপনি শুনেছেন যে এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল নার্ভ এজেন্ট সারিন গ্যাস। এটাও নিশ্চয়ই জানেন যে বিদ্রোহীরা এবং আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্সের মত তাদের পৃষ্ঠপোষকরা সিরিয়া সরকারকেই দায়ী করেছে এবং সিরিয়াকে শাস্তি দেবার জন্য সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে। কিন্তু আপনি কি এটা শুনেছেন যে গত মে মাসে তুরস্কের আদনান শহরে পুলিস আল নুসরা ফ্রন্টের ১২ জন সদস্যকে ২ কেজি সারিন গ্যাস সহ গ্রেপ্তার করে?[২৯] পরে অবশ্য তুর্কি সরকার এঘটনার কথা অস্বীকয়ার করেছিল। আরো একটা মারাত্মক তথ্য উঠে এসেছে মিন্টপ্রেস সংবাদসংস্থার অনুসন্ধানে। ঘুটায় গ্যাসে আক্রান্ত মানুষ, ডাক্তার, বিদ্রোহী ও তাদের পরিবার এবং সাধারণ নাগরিকদের সাক্ষ্য থেকে জানা গেছে সৌদি আরবের গোয়েন্দা প্রধান বান্দার বিন সুলতান ঐ অস্ত্রগুলো বিদ্রোহীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তবে চোঙাকৃতি গ্যাসবোতলের মত দেখতে ওগুলো কি ধরনের অস্ত্র বা কিভাবে ওগুলো ব্যবহার করতে হয় তা বিদ্রোহীরা জানত না বলে দাবী করেছেন সেদিনের ঘটনায় নিহত এক বিদ্রোহীর বাবা। একটা টানেলে সেগুলোকে লুকিয়ে রাখতে গিয়ে তারা বিস্ফোরন ঘটিয়ে ফেলে বলে সহযোদ্ধারা জানিয়েছেন।[৩০] 

বছরখানেক আগেই মার্কিন রাষ্ট্রপতি ওবামা রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারকে লালদাগ ঘোষণা করে বলেছিলেন ঐ লালদাগ অতিক্রম করলেই তাঁর সরকার সরাসরি সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করবে। কাকাবাবু, আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে সিরিয়ার সরকার যখন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সাফল্য অর্জন করছে, তখন খামোকা রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ মার্কিন আক্রমণকে নেমন্তন্ন করা তাদের পক্ষে চরম আহাম্মকি? আর আমেরিকার ওপর সৌদি আরবের নির্ভরতার কথা মাথায় রাখলে এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে আমেরিকাকে না জানিয়েই সৌদি সুলতান সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র পাঠিয়েছেন। এই সূত্রগুলো কিন্তু সিরিয়াকে ঘিরে একটা মারাত্মক চক্রান্তের দিকে ইঙ্গিত করছে। 

আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন সিরিয়াকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। প্রথম থেকেই সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্য ও মদত দিয়ে চলেছে সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, ইজরায়েলের মত আঞ্চলিক শক্তি এবং আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্সের মত সাম্রাজ্যবাদীরা। এই সমস্ত দেশগুলো সিরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে বিদ্রোহীদের জোট সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়ালিশানকে সিরিয়ার জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। আরব লীগের আমীর, শেখ, সুলতানরা গণভোটে নির্বাচিত আসাদকে স্বৈরাচারী আখ্যা দিয়ে সিরিয়াকে বহিস্কার করেছে। অন্যদিকে সিরিয়ার পাশে আছে ইরান। সোভিয়েত সঙ্গে সিরিয়ার যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তা বজায় আছে রাশিয়ার সঙ্গেও। তারা প্রথম থেকেই দুপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী কোফি আন্নান এবং পরে লাখদার ব্রাহিমি অবশ্য সে কাজে ব্যর্থ হয়েছেন। 

লালদাগ অতিত্রান্ত হওয়ার পর ওবামা এবার নতুন উদ্যমে সিরিয়ায় হামলার ছক কষেছেন। আগে দুবার রাশিয়া চীনের ভেটোয় রাষ্ট্রসংঘকে শিখণ্ডী করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এবার তাঁর কথায় "পক্ষাঘাতগ্রস্ত" রাষ্ট্রসঙ্ঘকে পাশ কাটিয়েই যা করার করতে চান তিনি। তবে সম্ভবতঃ রাসায়নিক অস্ত্রের ভয়েই সেনা না নামিয়ে আকাশপথে ষাট দিনের "সীমাবদ্ধ" আক্রমণের প্রস্তাব পেশ হয়েছে মার্কিন সেনেটে। কিন্তু এনিয়ে ওবামা কূটনৈতিকভাবে অনেকটাই ব্যাকফুটে। সিরিয়ার সংকটে দেশকে জড়ানোর প্রস্তাব খারিজ করেছে বৃটিশ পার্লামেন্ট। জার্মানী কোনরকম সামরিক অভিযানে যোগ দেবেনা বলে জানিয়ে দিয়েছে। গ্রীস তাদের সামুদ্রিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকার করেছে। ভারত স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের অনুমোদন ছাড়া কোনরকম সামরিক তৎপরতার বিরোধিতা করেছে। এমনকি আরব লীগ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও রাষ্ট্রসঙ্ঘের নেতৃত্ব ছাড়া অভিযানে আপত্তি জানিয়েছে। একমাত্র ফ্রান্স যুদ্ধ করতে এক পায়ে খাড়া। যে ফ্রান্সের রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক ইরাক যুদ্ধের কড়া বিরোধিতা করেছিল, সেই ফ্রান্সের স্যোসালিস্ট প্রেসিডেন্ট হোলান্দে এখন আসাদকে সরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। রাজনীতি বড় বিষম বস্তু কাকাবাবু! হয়ত সিরিয়া একসময় ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল বলে ঐ দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা তাদের কর্তব্য বলে ফ্রান্স মনে করে। ওদিকে ভূমধ্যসাগরের মার্কিন নৌবহর সিরিয়ামুখী হতেই চাপ বাড়াতে রাশিয়াও দুটো রণতরী পাঠিয়েছে। ইরান জানিয়ে দিয়েছে হামলা হলে তারা শেষ অবধি সিরিয়ার পাশে থাকবে।

শেষপর্যন্ত কি হবে, আসাদ কি আত্মসমর্পণ করবেন না কি সাদ্দাম-গদ্দাফির মত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেবেন, সিরিয়া কতটা প্রতিরোধ করতে পারবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের, রাশিয়া-ইরানের ভূমিকা কি হবে তা ভবিষ্যতই বলবে; কিন্তু সিরিয়ার মানুষের জন্য যে এখনও অসীম দুর্গতি অপেক্ষা করছে তাতে সন্দেহ নেই। তবে তাঁরা দুবছরে এই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের অভ্যস্ত করে নিয়েছেন। মার্কিন হুঙ্কারের বিরুদ্ধে এককাট্টা দামাস্কাসবাসী জানিয়ে দিয়েছেন তাঁরা কোন বিদেশী শক্তির কাছে মাথা নোয়াবেননা, প্রেসিডেন্ট আসাদের পাশেই থাকবেন।[৩১] এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সমাজকর্মীও বলছেন, "এ দেশের মানুষ বিদেশের সেনাকে দেশের মাটিতে দেখতে চায়না। স্বাধীনতা নিজেরাই রক্ষা করবে দেশের মানুষ।"[৩]

আমি ভাবছিলাম সাবা কাব্বানির কথা। আপনি যখন সন্তুকে জিজ্ঞেস করলেন, "এই দেশের কোন মানুষটাকে আমাদের সারাজীবন মনে থাকবে বল তো?" সে একটুও চিন্তা না করে বলল, "সাবা কাব্বানি"। কাব্বানি একজন কুর্দ, ইরাকে বাড়ি, সেখানকার আর্মিতে কাজ করত। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর একদিকে আমেরিকার দখলদারি, অন্যদিকে জাতিদাঙ্গায় ইরাক ছাড়খার হয়ে গেল। সব দেশেই যা হয়, যেকোন সমস্যার আঁচে সব থেকে বেশি পোড়ে কাব্বানির মত সংখ্যালঘুরা। একদিন রাত্রে কারা যেন তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দিল। ছেলের মাথায় বোমা পড়ল, বাকিরা ইরাক ছেড়ে পালিয়ে এল সিরিয়ায়। তার আরো এক মেয়েও হারিয়ে গিয়েছিল ইরাক যুদ্ধের সময়। সে বলেছিল, "জানি না, আল্লা আমাদের কপালে আরো কত কঠিন পরীক্ষার কথা লিখে রেখেছেন"। সাবা কাব্বানি এখন কোথায়? সে কি মাটি কামড়ে পড়ে আছে সিরিয়ায়, না ফিরে গেছে তার নিজের দেশ ইরাকে? নাকি আবার পাড়ি জমিয়েছে অন্য কোথাও, পরের পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার জন্য?




তথ্যসূত্র:
[১] সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আরবদেশে সন্তু কাকাবাবু, আনন্দ পাবলিশার্স
[২] Facebook page of Syrian Observatoryfor Human Rights
[৩] নিসান আহমাদো, নিঃশ্বাসে বিষ বিশ্বাসে দ্রোহ, এবেলা, ৩০ আগষ্ট, ২০১৩
[৪] দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ও রমাকৃষ্ণ মৈত্র, পৃথিবীর ইতিহাস, অনুষ্টুপ
[৫] Fertile Crescent, Wikipedia
[৬] History of Syria, Wikipedia
[৭] Robert Fisc, Maaloula, the past has relevance to Syria's tragic present, The Independent, September 3, 2012
[৮] Syria Islamist rebels take control of historic Christian town of Maaloula, CNN, September 8, 2013
[৯] List of heritage sites damaged during Syrian civil war, Wikipedia,  Al-Qaeda Takfiris Destroying World’s Heritage, Syrianews, May 2, 2013
[১০] Ba'ath Party, Wikipedia
[১১] Syria Profile: A chronology of key events, BBC
[১২] Bashar al-Assad, Wikipedia
[১৩] Timeline of the Syrian civil war, Wikipedia
[১৪] সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মিশর রহস্য, আনন্দ পাবলিশার্স
[১৫] Al-Qa'ida Islamists kill Syrian boy, 15, for "insulting the prophet", The Australian, June 11, 2013 
[১৬] Paul Wood, Face-to-face with Abu Sakkar, Syria's 'heart-eating cannibal' BBC, July 5, 2013
[১৭] Norm Dixon, How the CIA created Osama bin Laden, Green Left Weekly, September 19, 2001,
Noam Chomsky interviewed by David Barsamian, The United States is a Leading Terrorist State, Monthly Review, vol. 53, no. 6, November, 2001
[১৮] French spy shot dead Gaddafi on Nicolas Sarkozy's order, The Indian Express, October 1, 2012
[১৯] Al-Qaeda indicates responsibility for killing US envoy in Libya, urges more attacks, The Times of Israel, September 15, 2012
[২০] As foreign fighters flood Syria, fears of a new terrorist haven, The Times of India, August 8, 2013
[২১] Pakistan Taliban says its fighters in Syria, Al Jazeera, July 16, 2013
[২২] Al-Nusra leader meets CIA officials, Alalam, August 30, 2013
[২৩] দেবাশিস চক্রবর্ত্তী, কার যুদ্ধ সিরিয়ায়, গণশক্তি, ৩১শে আগষ্ট, ২০১৩,
নাজেস আফরোজ, রাসায়নিক অস্ত্রে হঠাৎ এত আপত্তি!, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৩
[২৪] Battle of al-Qusayr (2013), Wikipedia
[২৫] Key Free Syria Army rebel 'killed by Islamist group', BBC, July 12, 2013
[২৬] War in Syria inspires Kurdish unity, Al Jazeera, July 27 2013 
[২৭] Kurds, Islamists clash in north Syria, at least 12 jihadists killed, The Daily Star Lebanon, August 03, 2013 
[২৮] 2013 Ghouta attacks, Wikipedia
[২৯] Turkey finds sarin gas in homes of suspected Syrian Islamists, Strategic Culture Foundation, May 31, 2013
[৩০] Dale Gavlak and Yahya Ababneh, Syrians In Ghouta Claim Saudi-Supplied Rebels Behind Chemical Attack, August 29, 2013 
[৩১] নিয়তির হাতে ভবিতব্যকে সঁপেছে দামাস্কাস, বর্তমান, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

Tuesday, 19 September 2017

সাতনায় সাবধান

সেবার মধ্যপ্রদেশ যাচ্ছিলাম চারজনে মিলে। শিপ্রা এক্সপ্রেস যখন সাতনা স্টেশনে থামল তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেলে ঢলতে আরম্ভ করেছে। সাতনা নিয়ে খুব একটা প্ল্যান ছিল না। পরের দিন খাজুরাহো যাওয়ার কথা। চিত্রকূট পাহাড়ের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু হাফবেলায় চিত্রকূট অভিযান সম্ভব ছিল না। ট্রেনে এক মাড়োয়ারি ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। খাসা লোক। জেনেরেটরের ব্যবসা। সেই কাজেই সাতনা যাচ্ছেন। শ্রীরূপার সঙ্গে খাঁটি হিন্দিতে গপ্পো জমিয়ে দিলেন। মেয়ে জামাই কুয়েত না ইউএই কোথায় যেন থাকে। ছেলে আছে। ছেলের বৌ একটা ইংরেজি স্কুলে পড়ায়। পুত্রবধুর চাকরি করাটাকে তিনি বেশ সহজভাবেই মেনে নিয়েছেন। নিজের স্ত্রীকে বলেছেন "ও যদি সংসারের কাজ গুছিয়ে চাকরি করতে পারে তোমার অসুবিধে কি? তুমি ধর্মকর্ম নিয়ে থাকো।" আমাদের মিষ্টি অফার করলেন, "মারোয়াড়ি মিষ্টি টেস্ট করে দেখুন?" উনি একটু বাথরুমে যেতেই তন্ময় বলল "মিষ্টিটা ফেলে দে। রেলের নোটিশ দেখিসনি, অপরিচিত ব্যক্তির হাত থেকে খাবার খাবেন না?" আমি তো জাতপেটুক, তাই ওসব সতর্কবাণীতে কান দিলাম না। আর সৌম্য আপার বাঙ্কে চাদর চাপা দিয়ে নাক ডাকাচ্ছিল। মিষ্টি খেয়ে আবার উঠে নাক ডাকাতে লাগল। তো সেই মাড়োয়ারি ভদ্রলোক বলেছিলেন, "সাতনায় যখন নামছেন, মাইহারের সারদা মন্দির অবশ্যই দেখবেন। ভীষণ জাগ্রত।" ভক্তিভাব কারোরই প্রবল না হলেও শেষমেশ মাইহার যাওয়াই মনস্থ করলাম। একটা হোটেলে অতিকষ্টে "পিওর ভেজ থালি" খেয়ে এসে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে খোঁজ করে গণেশ প্রজাপতি নামে এক ছোকরা কে তন্ময়ের পছন্দ হল। সে ট্যাক্সি চালানোর পাশাপাশি একটা কলেজে বিটেক করছে। ঠিক হল মাইহার তো ঘুরিয়ে আনবেই, পরের দিন আমাদের খাজুরাহোতেও ছেড়ে আসবে। 



মাইহার সাতনা স্টেশন থেকে প্রায় ৪৫ কিমি দূরে। পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। গাড়ী দাঁড়ালো পাহাড়ের নিচে। তারপর রোপওয়ে করে প্রায় ৫০০ মি উঁচু পাহাড়ের ওপর চড়া। দড়ির লাইন বেয়ে একটা বাক্সে চারজন উঠলাম। নিচের দিকে ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসা শহর ও জঙ্গল দেখে বুক কেঁপে উঠল। বিশেষতঃ যখন বাক্সটা লোহার রেলিং দিয়ে দিক বদলাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি দড়ির বাঁধন ত্যাগ করে দেশলাই বাক্সটা খাদের পথে যাত্রা করে! যত ওপর দিকে উঠছি, নীচের শহর ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে আর অন্ধকার গাঢ় হওয়ার সাথে সাথে তলায় বিন্দু বিন্দু আলোর ফুলকি জ্বলে উঠছে। রোপওয়ে আমাদের নিয়ে গেল পাহাড়ের একদম মাথায়, মন্দিরের সামনে। মন্দিরের মধ্যে একটা সরু রাস্তা দিয়ে লাইন দিতে হল সারদা ওরফে দুর্গা মা কে দেখার জন্য। দেখি সে লাইন আর নড়ছেই না। আমাদের কারোরই ভক্তিভাব নেই, পাহাড়ে চড়তেই এসেছিলাম, মাতাজিকে দর্শন দেবার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। শ্রীরূপা বলল চলো ফিরে যাই। কিন্তু ফেরার রাস্তা বন্ধ, আমাদের পেছনে তখন প্রচুর লোক লাইন দিয়েছেন। একজন পুরোহিতকে সামনে পেয়ে বললাম আমার স্ত্রীর শরীরটা ভালো লাগছে না, ফিরে যাব। তিনি বললেন, মাতাজি কে দর্শন না করে ফেরা যাবে না। আরেকজন পুরোহিতকে ডেকে আমাদের দেখিয়ে কিছু বললেন, সম্ভবত আমরা যাতে পালাতে না পারি সেইদিকে নজর রাখতে বললেন। আরেকটু এগোতেই দেখলাম আরেকটা রাস্তা দিয়ে লোক পিলপিল করে লোক ঢুকছে। কপালে গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা। হাতে লাঠি, মুখে উন্মত্ত স্লোগান, "মাতাজি কি জ্যেএএএ"। এরা সবাই হেঁটে পাহাড়ে উঠছে।  চোখে ভেসে উঠল টিভিতে দেখা কুম্ভমেলা বা মক্কায় তীর্থযাত্রীদের পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ছবি। মনে পড়ল মধ্যপ্রদেশ দীর্ঘদিনের বিজেপি শাসিত রাজ্য। প্রাণ নিয়ে বাঁচতে পারলে হয়! তন্ময় খেয়াল করল রোপওয়ের দিকে লাইন একটু হালকা হয়েছে। চারজন চটপট ঘুরে উল্টোদিকে দৌড় দিলাম। এক পুরুত বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে এড়িয়ে আমরা কোনরকমে গিয়ে রোপওয়েতে বসলাম। যে বিপদ থেকে পালিয়েছি, সেটার কথা ভেবেই বোধহয় ফেরার সময় রোপওয়ে নিয়ে কোন আর ভয় রইলনা। 

সেদিনটা ছিল দুর্গাপুজোর দশমী। ফেরার পথে কয়েকটা দুর্গাঠাকুর দেখলাম, ভাসানের জন্য বেরিয়েছে। লক্ষ্য করলাম এই দুর্গাঠাকুরের দুটো মাত্র হাত, সঙ্গে তাঁর ছেলেমেয়েরাও নেই। ডান হাতে ত্রিশূল থাকলেও বাঁহাত শঙ্কাহরণ করে না। "ললাটনেত্র আগুণবরণ" বটে কিন্তু "দুই নয়নে স্নেহের হাসি" নেই। বুঝলাম এই সারদা মাতাজি আমাদের গিরিকন্যা উমা নন। কার্তিক-গণেশ-লক্ষী-সরস্বতীর স্নেহময়ী মা-দুর্গা নন। ব্যোম ভোলানাথের দশভূজা পার্বতীও নন। বরের ওপর রাগ করে বাপের বাড়ি চলে আসার মানুষোচিত চপলতা তাঁর মানায় না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিউটি পার্লারে যাওয়ার স্বাধীনতা তাঁর নেই। তিনি শুধু মহিষাসুরকে বধ করেন।

ফেরার সময় গণেশজি জানালেন মাতাজিকে দর্শন না করে পিঠ দেখিয়ে চলে আসলে মৃত্যু অনিবার্য। দুবছর হতে চলল, আমরা সবাই অক্ষতদেহে বেঁচে আছি। তবু গণেশজি যখন বলেছেন, মৃত্যু নিশ্চয়ই অবধারিত! তাই আর দেরি না করে সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা লিখে ফেললাম। 

Monday, 14 August 2017

মুক্তা কুমার, ছোট্ট পত্রিকা এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

দিদা বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হত একশো বছর। বাবার মা কে ঠাকুমা বলারই চল আছে। কেন জানি না আমি আর দাদা দুজনেই তাঁকে দিদা বলেই ডাকতাম। দাদু যখন মারা যান তখন আমার বয়স মেরেকেটে নয়। তাছাড়া শেষ কয়েকটা বছর তিনি ভীষণ অসুস্থ আর শয্যাশায়ী ছিলেন। কাজেই দাদুর স্মৃতি আমার কাছে খুব একটা নেই। কিন্তু ছোটবেলার অনেকটাই কেটেছে দিদার স্নেহচ্ছায়ায়। বাবা মা দুজনেই স্কুলে চাকরি করতেন। ফাইভ অবধি সকালের স্কুল করে এসে তো দিদার কাছেই থাকতাম। তখন মোড়ে মোড়ে মিষ্টির দোকান গজিয়ে ওঠেনি। দুপুর বেলায় রাস্তা থেকে হাঁক শোনা যেতঃ খাবাআআআর। আর শুনেই একদৌড়ে দরজার বাইরে। বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা মাথার ঝাঁকা সামনের রোয়াকে নামাতেন আর তার মধ্যে থেকে বেরতো মেঠাই, সন্দেশ, গজা, নিমকি ... আরো কত কি। দিদা আঁচলের গিঁট খুলে পয়সা বের করার আগেই তার বেশ কয়েকটা চালান হয়ে যেত আমার মুখে। তখনো অবশ্য জানতাম না দিদা কতটা বড় মাপের মানুষ। তবে বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকত। দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরা যেমন আসতেন তেমনি আসতেন এলাকার নানা মানুষ, দল ও মহিলা সমিতির কর্মীরা। আজও লোকে আমায় চেনে "দয়াল মাস্টার" আর "মুক্তাকাকিমার নাতি হিসেবেই"। 

দিদার জন্ম ১৯১৭ সালের ভাদ্রমাসে, বর্ধমানের একটা সম্পন্ন পরিবারে। তখন তাঁর নাম ছিল হরিমতী। দাদাদের থেকেই স্বদেশী হাওয়ায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে দয়াল কুমারের সঙ্গে বিয়ে হয়। "মুক্তা" নামটা দাদুই দিয়েছিলেন। তারপর, দিদার নিজেরই কথায়, দেশপ্রেমের আবেগকে শ্রেণিচেতনার আবেগে সেঁকে নেওয়া, দাদুর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেমে, দ্রোহমূলক গান কবিতা লিখে রাজরোষে পড়ে প্রথমে ব্রিটিশ তারপর স্বাধীন ভারতের কারাগারে অন্তরীণ হওয়া। দিদার যুদ্ধ, দাঙ্গা, মহামারীর সময় মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির মাধ্যমে ত্রাণ ও সেবাকার্য সংগঠিত করা। সুইজারল্যান্ডের লুসান শহরে বিশ্ব মাতৃ সন্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করা। আর এসবের সঙ্গেই প্রবল অনটনের মধ্যে দশ ছেলেমেয়েকে মানুষ করে তোলা।

তখন সম্ভবতঃ ফাইভে পড়ি। এক লোডশেডিং এর রাতে আমি আর দাদা হঠাৎ ঠিক করলাম একটা হাতে লেখা পত্রিকা বের করব। বাবা-কাকা-পিসি রা তাদের ছোটবেলায় বাড়ির সবার লেখা দিয়ে ঐরকম একটা হাতে লেখা পত্রিকা করেছিল। সেটা দেখেই হয়ত এমন ভাবনা। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। পর পর পাঁচ মাস ধরে বেরলো সেই "ছোট্ট পত্রিকা"। প্রথম সংখ্যার কয়েকটা ফাঁকা পাতা রাখা হয়েছিল যাতে বড়রা মতামত জানাতে পারে। সেই পাতায় দিদা লিখেছিলেনঃ 
"এতদিন আমার মনের মাঝে যে বীজ বপন করা ছিল, তোমাদের উদ্যোগে ছোট্ট পত্রিকা প্রকাশনার মধ্যে অঙ্কুরিত হতে দেখে আশান্বিত হলাম। উত্তরোত্তর শাখাপ্রশাখা পল্লবিত হয়ে উঠুক। -- দিদা, ডিসেম্বর ১৯৯৬।"
পত্রিকার শেষ তথা শারদ সংখ্যায় স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে তিনি একটা ছোট্ট প্রবন্ধও লিখলেন। আরো বছর পাঁচেক পরে বন্ধুরা মিলে যখন "অভিযান" পত্রিকা বের করলাম তখনও তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, "তোকে সায়েন্স নিতে হবে না, তুই আর্টস নিয়ে পড়বি।" তাঁর কথা অবশ্য রাখতে পারিনি। দিদার মৃত্যুর কয়েকমাস পরেই আমি মাধ্যমিক দিলাম। তারপর "অভিযান" পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় স্বাধীনতার ৫০ বছরের সেই লেখাটা আবার ছাপা হল। একটা সুন্দর হেডপিস এঁকে দিয়েছিল সমদা (স্মিতধী গাঙ্গুলী)। স্বাধীনতার ৭০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে সমদার হেডপিস সহ পুরো লেখাটাই দিয়ে দিলাম। 



শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশ কিছুদিন কলকাতার কসবায় ছোট ছেলের চিকিৎসাধীনে ও তত্ত্বাবধানে ছিলাম। সেই সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। তখন শুয়ে শুয়ে সম্পূর্ণ বিশ্রামের মধ্যে অন্য কিছুই করতে পারতাম না। সময়মত ঝর্ণা রেডিওটা খুলে দিয়ে যেত, শুনতাম। গত একবছর ধরেই প্রচারমাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর নানা অনুষ্ঠানের কর্মসূচী শুনে আসছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে কোন স্তরে কোন সাড়াই যেন পেলাম না - একমাত্র প্রচারমাধ্যমে কিছু কিছু শুনলাম। সমস্ত এলাকাটাই যেন নিস্তব্ধ। এই নিরিবিলি বিশ্রামের মাঝে পঞ্চাশ বছর আগের সেই প্রথম স্বাধীনতা দিবসের স্মৃতি মনকে আলোড়িত করে তুলতে লাগল। 

সেই দিনের প্রাক্কালে পাড়ায় এবং বাড়িতে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। অজয় বলে একটি ছেলে বাড়ি থেকে চলে এসে আমাদের পরিবারের সঙ্গে প্রায় একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। দয়াল কুমারের নির্দেশনায় ছোট বড় অশোক চক্রের ব্লক অজয় নিজেই তৈরী করেছিল। তারপর কয়েকদিন ধরে পতাকা সেলাই করতে লেগেছিল। ছোট-বড়, ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে বাড়িতেও একটা উৎসব করার মতলব ভাঁজা হচ্ছে। সকলের ভাবনা এটাই যে, দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের হাত থেকে স্বাধীনতা উদ্ধার হবে ১৫ই আগষ্ট। সমস্ত ভারতবাসী খেতে পাবে, পড়তে পাবে, কাজ পাবে এই আশায় সর্বস্তরের ও সব বয়সেরই মানুষ যেন অজানা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। সারা রাত্তির ধরে পতাকা তৈরী হয়েছে, বাড়ির সবাই যোগান দিয়েছে। ভোরবেলাতেই ছনি পরিমল এদের নেতৃত্বে জাতীয় সঙ্গীতের প্রভাতফেরি সারা অঞ্চলটাকে স্বাধীনতা দিবসের আনন্দে উদ্ভাসিত করে তুলল। ভোর হতেই ছোট ছোট পতাকা হাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়ল এবং বড়রা পতাকা নিয়ে গেল বাড়িতে লাগাবে বলে। আমারও উৎসবের আনন্দে রান্নায় মন লাগছিল না। বারবার সদরে বেরিয়ে এসে কিশোর বাহিনী ও অন্যান্যদের উচ্ছাস ও আনন্দ দেখছিলাম। 

সেদিনের স্বাধীনতার আনন্দ ও আশা আর পঞ্চাশ বছর পর এই দিনটিতে মানুষের উচ্ছাস ও আবেগের আকাশ পাতাল তফাত। যে আশা নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলাম তার বেশীরভাগই আজ অসম্পূর্ণ, অপূর্ণ। আজ সমস্ত দিকে নির্লিপ্ততা ও শূন্যতার মাঝে মনের মধ্যেও শূন্যতা ও বিষাদ অনুভব করছি। আশা এই যে সমাজ ব্যবস্থার সততই পরিবর্তন হয়। আজ আমি বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে এই প্রত্যয় রাখছি তারা সকলের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষার সংগ্রাম করে যাবে এবং অদূর ভবিষ্যতে সকলের জন্য একটা সুখী সমাজ কাঠামো গড়ে তুলবে। 

সুবর্ণজয়ন্তীর শুভলগ্নে আমার জীবনসন্ধ্যার প্রাক্কালে এই আশা রাখছি। 
দশ সন্তানের সঙ্গে দিদা

Wednesday, 9 August 2017

ভোটের গেরোয়

সমনটা যখন হাতে পেলাম একটু টেনশান যে হচ্ছিল তা অস্বীকার করব না, তবে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে ভেবে উত্তেজনাও অনুভব করছিলাম। একবছর হল কলেজের চাকরিতে যোগ দিয়েছি। এর মধ্যেই সহকর্মীদের কাছে  ভোটের নানা গল্প আর সেইসঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ মাথায় নোট করা হয়ে গেছে। ভোটের আগের দিন (যাকে পি-১ ডে বলা হয়) ব্যাগপত্তর গুছিয়ে ট্রেনে করে পাণ্ডুয়া স্টেশনে নামলাম। আরো অনেক ভোটকর্মীর দেখা পেলাম স্টেশনে। তাঁদের সঙ্গেই নির্বাচন কমিশনের বাসে উঠলাম। তারপর সোজা ডিসি অর্থাৎ ডিস্ট্রিবিউশান সেন্টার। বেশ বড় জায়গা। কিন্তু সূর্যের তেজ ক্রমেই বাড়ছে। প্লাস্টিকের গ্লাসে করে গ্লুকোজ মেশানো জল বিতরন করা হচ্ছিল। তাই এক গ্লাস পান করে কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালাম। ইতিমধ্যে অন্য পোলিং অফিসাররাও এসে গেছেন। সবাই মিলে জিনিসপত্র সব মিলিয়ে নিলাম। ইভিএম টা ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করে নিলাম। এতদিন সিইউ/বিইউ বলতে বুঝতাম ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি আর বর্ধমান ইউনিভার্সিটি। এবার জানলাম ঐ চারটি অক্ষর দিয়ে কন্ট্রোল ইউনিট আর ব্যালট ইউনিটকেও বোঝানো যেতে পারে! আরেকটা কাজ বাকি ছিল, তা হল একজন লাঠিধারী পুলিসকে ট্যাগ করা। সেজন্য পুলিসের ক্যাম্পে গিয়ে তো চক্ষু চড়কগাছ! অন্তত ১০০ প্রিসাইডিং অফিসার লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। আর লাইন এগোচ্ছে কচ্ছপের গতিতে! এভাবে চললে তো বুথে পৌঁছতে রাত্তির হয়ে যাবে। সবার মনেই সেই আশঙ্কা। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চড়ছে মেজাজ! দু অক্ষর, চার অক্ষর বেরোতে শুরু করল। শেষে রিটার্নিং অফিসার এসে সবাইকে আশ্বস্ত করলেন, আপনারা বুথে চলে যান, পুলিস পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অতএব আমাদের জন্য নির্ধারিত বাসে উঠলাম। আমাদের ডিউটি পড়েছে একটা আদিবাসী এলাকায়। আরো দুটো সংলগ্ন বুথের ভোটকর্মীদের নিয়ে বাস ছাড়ল। "জয় ভোটবাবার জয়" বলে রওয়ানা দিলাম।

পৌঁছলাম দিনের আলো থাকতেই। শাল গাছে ঘেরা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন প্রাইমারি স্কুলটা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। একটু ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করেই মেঝেতে চাদর পেতে কাজে লেগে পড়লাম। শুধু ভোট নেওয়া নয়, প্রচুর ফর্ম ও কাগজপত্র পূরণ করার থাকে। আর প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে আমার সই সর্বত্র বাধ্যতামূলক। সবাই মিলে সে সব কাজ যতটা সম্ভব এগিয়ে রাখা গেল। এর মধ্যে দুজন গ্রামবাসী এসে হাজির, আমাদের সব কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা খোঁজ নিতে। পরিচয় জানতে বললেন তিনি আবদুল রহিম নবির পোলিং এজেন্ট। এখানে বলে রাখি পাণ্ডুয়া বিধানসভা কেন্দ্রে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের আবদুল রহিম নবি এবং সিপিএমের শেখ আমজাদ হোসেন। বিজেপির অশোক ভট্টাচার্য এবং আরো তিনটে ছোট দলের প্রার্থীরাও ছিলেন। এছাড়া ছিলেন একজন নির্দল, তাঁরও নাম শেখ আমজাদ হোসেন! তো এজেন্ট মশাইকে জানিয়ে দিলাম পরদিন যেন সকাল সকাল চলে আসেন। "কোন চিন্তা নেই স্যার, ছটার মধ্যে চলে আসব।" বলে বিদায় নিলেন এজেন্ট সাহেব।

রাতের খাওয়াটাও ভালো হয়েছিল। স্কুলের মিড ডে মিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা মোটা চালের ভাত, আলুপোস্ত আর ডিমের ঝোল খাওয়ালেন। খাওয়াদাওয়া সেরে শোয়ার তোড়জোড় করছি এমন সময় আরেক বিপত্তি। বুথের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান একটা কাগজ এনে হাজির, সই করে দিতে হবে। কাগজটা পড়ে তো পিলে চমকে উঠল। এ যে ফায়ারিং অর্ডার! বোঝ ঠ্যালা, কোথাকার এক ছাপোষা সহকারি অধ্যাপক, ইনসাসধারী ফেট্টিবাঁধা জওয়ান কি না তার কাছে গুলি চালানোর আনুমতি চাইছেন! ওঁদের যুক্তি গুণ্ডারা হামলা করলে তখন আর অনুমতি দেওয়ার সময় থাকবেনা, এমনকি অনুমতি দেওয়ার জন্য আমি জীবিত নাও থাকতে পারি, তাই আগেভাগেই এই ব্যবস্থা। শেষে সেক্টর অফিসারকে ফোন করলাম এবং তাঁর পরামর্শ মেনে ফায়ারিং অর্ডারে সই করলাম না। জওয়ান মশাই ক্ষুব্ধ হলেন এবং যাওয়ার আগে সতর্ক করে গেলেন, ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে ওনারা দায়িত্ব নেবেন না! কি আর করা। দরজায় একটাই ছিটকিনি। সেটা এঁটে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। 

পরের দিন আলো ফোটার আগেই ঘুম ভেঙে গেল। টিউবওয়েলে চান করে রেডি হয়ে নিলাম। ৬টা বাজতে না বাজতেই পোলিং এজেন্টরা উপস্থিত। প্রথমেই গতকালের মক্কেল। তাঁর হাতের কাগজটা নিয়ে দেখি সেটা নির্দল প্রার্থী শেখ আমজাদ হোসেনের এজেন্টের নিয়োগপত্র। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 
"গতকাল যে বললেন আপনি রহিম নবির এজেন্ট? রাত পোহাতেই আমজাদ হোসেনের এজেন্ট হয়ে গেলেন?"
"হ্যাঁ স্যার, বদলে গেছে।" 
কি আর করা নিয়োগপত্র যখন এনেছেন ওনাকে আমজাদ হোসেনের এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে দিতে বাধ্য আমি। পরে, রিলিভিং এজেন্টের হাতে দায়িত্ব দিয়ে বুথ ছাড়ার সময় তিনি আমার কাছে এসে রহস্যটা ফাঁস করে গেলেন। "আমরা স্যার টিএমসি করি, নির্দলের হয়ে কাজ করছি। দলটা ভারী করে নেওয়া, আর কি! ট্যাকটিক্স স্যার, বুঝলেন না?!" 

সব এজেন্টকে এনট্রি পাস ইস্যু করে মক পোল শুরু করতে যাব, এমন সময় আরেকজন হাজির। তিনি বিজেপি প্রার্থী অশোক ভট্টাচার্যের এজেন্ট। তাঁর নিয়োগপত্রটায় দেখি শুধু প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টের সই ছাড়া বাকিটা ফাঁকা! কোথায় কি লিখতে হবে দেখিয়ে তাঁকে কাগজটা ফেরৎ দিলাম। তবু দেখি তিনি মাথা চুলকোচ্ছেন। বুঝলাম লেখা-পড়ার সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমার হাত পা বাঁধা, প্রিসাইডিং অফিসার হয়ে একজন এজেন্টের ফর্ম ফিলআপ করে দিতে পারিনা। শেষে মুশকিল আসান হলেন সিপিএমের বয়স্ক এজেন্ট।
 "কি রে ভাই পারছিস না? আয় আমি লিখে দিচ্ছি।" 
"হ্যাঁ দাদা দেখো দিকি" হাতে চাঁদ পেয়ে ফর্মটা এগিয়ে দিলেন বিজেপির এজেন্ট। 
মক পোল শেষ করে ৭টায় ভোট চালু করতে গিয়ে দেখি বাইরে বিশাল লাইন। মহিলারাই সংখ্যায় বেশী। তারপর নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হল। ১১টার মধ্যেই ৫০% ভোট পড়ে গেল। ভোট দেওয়ার জন্যে মানুষের এত উৎসাহ এখানে না এলে জানতেই পারতাম না। জানতে পারতাম না কোনরকম জল না মিশিয়েই ৮৪% ভোট হতে পারে। প্রায় অথর্ব বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, চোখে দেখতে পান না এমন মানুষেরা ভোট দিতে চলে এসেছেন ছেলে, বৌমা বা নাতির হাত ধরে! ভাবছিলাম কারা বেশী সচেতন? এই অশিক্ষিত আদিবাসী মানুষগুলো না কি আমার শহুড়ে বন্ধুরা, যারা বলে "ধুসস ভোট দিয়ে কি হবে, এক দিন ছুটিতে মস্তি করি!" বেলা বাড়তে ভোটারদের লাইন ক্রমশ হালকা হল। আমরা একে একে খেয়ে এলাম। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সিপিএমের এজেন্ট জল আনতে গেলেন, তৃণমূলের এজেন্ট বললেন "চলো চাচা আমিও যাই।" বিজেপির এজেন্ট নিজের বোতলটা ধরিয়ে দিলেন, "এটা একটু ভরে আনিস তো।" আমি চেয়ারে বসে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম সেই দৃশ্য। তৃণমূলের এজেন্ট টিউবকলের হাতল টিপছেন আর সিপিএমের এজেন্ট জল ভরছেন। তাঁদের ব্যবধান, হ্যাঁ কয়েক ইঞ্চির বেশী হবে না!

নির্ধারিত সময়েই, সন্ধ্যা ৬টায় ভোট শেষ হল। ঘন্টা দুয়েক বাদে বাস এল। এবার মহামূল্যবান ইভিএম যন্ত্র নিয়ে ডাইনে বাঁয়ে সশস্ত্র জওয়ান পরিবিষ্ট হয়ে পৌঁছলাম আগের যায়গায় যা এখন বদলে গেছে আর সি অর্থাৎ রিসিভিং সেন্টারে। লাইন দিয়ে, গুঁতোগঁতি ও মারামারি করে দরকারি কাগজপত্র সমেত বাক্সবন্দী ইভিএম জমা দিয়ে অব্যাহতি পেলাম। তারপর শেষ ট্রেন ধরলাম ফেরার জন্য। 

প্রথম প্রকাশঃ Deconfined, August 2016

Friday, 30 June 2017

Not in My Name

জুন ২০১৪, পুণে৷ নরেন্দ্র মোদি তখতে বসার এক সপ্তাহের মধ্যে ২৪ বছরের তরুণ সফটওয়ার কর্মী মহসিন শেখ কে পিটিয়ে মারল হিন্দু রাষ্ট্র সেনা৷ "একটা উইকেট পড়ল" বলে উল্লাস শোনা গেল তাদের গলায়৷ মহসিনের অপরাধ, তিনি নাকি শিবাজি ও বাল থ্যাকারে কে নিয়ে "আপত্তিকর" পোস্টে লাইক দিয়েছিন৷ হত্যাকারীদের অধিকাংশই জামিনে মুক্ত৷ কারণ ভারতীয় আদালতের মতে তাঁরা ধর্মীয় প্রেরণায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়৷

সেপ্টেম্বর ২০১৫, দাদরি৷ স্থানীয় মন্দির থেকে ঘোষণা হল মহম্মদ আখলাকের ফ্রিজে গরুর মাংস আছে৷ উন্মত্ত জনতা বাড়ি থেকে টেনে বের করে খুন করল পঞ্চাশোর্ধ আখলাককে৷ খুনিদের গ্রেফতার না করার দাবীতে জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলল বিজেপি৷ আখলাকের পরিবারের বিরুদ্ধে গোহত্যার মামলা দায়ের করল পুলিস৷ ফ্রিজে রাখা মাংস বিফ না মটন জানতে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হল৷ আর বছরখানেক বাদে খুনিদের একজনের মৃত্যু হলে তার গায়ে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন হল৷

এপ্রিল ২০১৭, আলোয়াড়৷ রাজস্থানের হাট থেকে গবাদিপশু কিনে ফেরার পথে গোরক্ষকদের হাতে পড়লেন হরিয়ানার দরিদ্র কৃষক পেহলু খান এবং যথারীতি গোরু পাচারের ধুয়ো তুলে তাঁকে হত্যা করল গোরক্ষকরা৷ রাজস্থান সরকার গোরক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পেহলুর পুত্রের বিরুদ্ধেই গোরু পাচারের কেস দিয়ে দিল৷

জুন ২০১৭, প্রতাপগড়৷ স্বচ্ছ ভারত অভিযানের নামে বস্তির মহিলাদের মলত্যাগ করার ফটো তুলছিল মিউনিসিপ্যালিটির কর্মচারীরা৷ সিপিআই (এমএল) লিবারেশান কর্মী এবং রাজস্থানের নির্মাণকর্মী আন্দোলনের সংগঠক জাফর হোসেন প্রতিবাদ করলে "স্বচ্ছ ভারত অভিযান"এ বাধা দেওয়ার জন্য তাঁকে পিটিয়ে মারল পুরকর্মীরা৷

জুন ২০১৭, দিল্লী মথুরা ট্রেন৷ নাহ, ঈদের বাজার করে ঘরে ফেরার সময় জুনায়েদ খানকে মেরে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার জন্য আর ফেসবুক লাইক, গোরক্ষা বা স্বচ্ছ ভারতের মত কোন অজুহাতের প্রয়োজন হয়নি৷ টুপি, পায়জামা, পাঞ্জাবীতে প্রতীয়মান ১৫ বছরের যুবকের ধর্মীয় পরিচয়ই তার বেঁচে থাকার অধিকার হারানোর পক্ষে যথেষ্ট কারণ বলে বিবেচিত হয়েছিল সহযাত্রীদের কাছে৷

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, উনা থেকে গিরিডি - দেশজুড়ে আরো অজস্র ঘটনার কথা বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে৷ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে পরাজয়ে হতাশ দ্বেষভক্তরা উল্লসিত - "ওদের" একটার পর একটা উইকেট পড়ছে যে! হিন্দুধর্মের নামে এইসমস্ত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হলেও এসবের জন্য হিন্দুধর্মকে দায়ী করা ঠিক নয়৷ কোটি কোটি সাধারণ হিন্দু আরেসেস-বিজেপি চক্র কে সমর্থন করেন বলেও মনে হয় না৷ কিন্তু বেশী দেরী হওয়ার আগে সাধারণ ধার্মিক হিন্দুরা সোচ্চার হোন গো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে৷ নাহলে চৈতন্য-রামকৃষ্ণদের সরিয়ে গোসন্ত্রাসীরাই হিন্দুধর্মের মুখ হয়ে উঠবেন৷

সংযোজনঃ আগষ্ট ২০১৬, উদুপি৷ গরু কিনে ফেরার পথে ২৯ বছরের ব্যবসায়ী প্রবীণ পুজারি নিহত হলেন "হিন্দু জাগরণ ভেদিকে" সংগঠনের কর্মীদের হাতে৷ ওরা বোধহয় জানত না প্রবীণ কর্ণাটকের কেনজুর গ্রামের বিজেপি সভাপতি ছিলেন৷ গোসন্ত্রাসবাদী দের হাত থেকে হিন্দুরাও রেহাই পাবে না৷ বিজেপি করলেও না৷


ওপরের লেখাটা ফেসবুকে পোস্ট করেছি ২৯শে জুন। তারপরও তালিকাটা বেড়েই চলেছে।

জুন ২০১৭, রামগড়। বাজার থেকে মাংস কিনে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন ৫০ বছরের আসগড় আলি ওরফে আলিমুদ্দিন। পথের মধ্যে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আলিমুদ্দিনকে টেনে নামিয়ে তাঁকে পিটিয়ে মেরে ফেলে, গাড়িটাও জ্বালিয়ে দেয়। ছুতো সেই একই - আলিমুদ্দিন না কি গাড়িতে করে গরুর মাংস নিয়ে যাচ্ছিলেন! অন্যান্য ঘটনার মত এক্ষেত্রেও ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সরকারের পুলিস অপরাধীদের গ্রেফতার না করে গাড়িতে রাখা মাংসটা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়েছে।

Thursday, 29 June 2017

ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিশ ইয়াক ইয়াক

তখনো ফোন বলতে তার লাগানো ল্যান্ডলাইন ফোনই বোঝাতো, ডায়াল ঘুরিয়ে ফোন করতে হত বলে সববার নাম্বার মুখস্থ থাকত। কম্পিউটার, ইন্টারনেট এসব শব্দ সবে শোনা যাচ্ছে। তখন টিভি বলতে বোঝাত ডিডি-১ আর ডিডি-২; যাদের  কেবল টিভি এসে গেছিল, রুদ্ধশ্বাস খেলার দিনে তাদের বাড়িতে লোকের ভিড় জমে যেত। তখনো বাংলা মাধ্যম ইস্কুলে পড়াটা হীনমন্যতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় নি, তখনো বাবা-মা রা টিউশন পড়ানোর জন্য দুবেলা এসকর্ট করে নিয়ে যেতেন না। তখনো মহম্মদ আজহারউদ্দিন ভারতের হয়ে টস করতে নামতেন, সৌরভ গাঙ্গুলী লর্ডসে সেঞ্চুরি করেছে কি করেনি। তখনো আনন্দমেলার পুজোসংখ্যায় নিয়মিত হাজিরা দিতেন কাকাবাবু, কিকিরা, অর্জুন, অরণ্যদেব; কখনো সঙ্গ দিত কলাবতী, ফ্রান্সিস, পাণ্ডব গোয়েন্দা। সেবারই শেষবারের মত মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথ নিলেন জ্যোতিবাবু; আর কিছু মাস পরেই কংগ্রেস ত্যাগ করে নিজের দল খুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সেই বছরই আমি মর্নিং সেকশান পার করে ডে সেকশানে ভর্তি হলাম আর প্রথম দিনই
নীলপাহাড়িতে সবুজদাড়ি সাতকড়ি সাঁতরার সঙ্গে চারমূর্তি।
ঝাউ বাংলো রহস্য। শিল্পীঃ সুবোধ দাশগুপ্ত
পরপর তিনটে ক্লাসে মনিটারের খাতায় নাম উঠতে দেখে এসকেবি স্যার আমাকে আর সৈকতকে দরজার বাইরে নিল ডাউন করে শাসিয়ে দিলেন, "এই দুটো নাম আর একবার দেখলে কিন্তু পিঠের চামড়া তুলে নেবো!" সেবারই আমি আর দাদা মিলে হাতে লেখা "ছোট্ট পত্রিকা" বের করলাম আর সৈকত ওর বোনের সঙ্গে বের করল "দুর্লভ পত্রিকা"  সেই সব পত্রিকাতেই আমি গল্প লিখব "গুপিদা" আর তার সাঙ্গপাঙ্গো ন্যাপলা, টুটুন, বুবাই-কে নিয়ে আর সৈকত লিখবে "শিবুদা" কে নিয়ে। এদিকে গুপিদা হানাবাড়িতে রাত কাটাতে গিয়ে ভূতের ভয়ে দৌড় মারবে আর ওদিকে শিবুদা মাছ ধরার কম্পিটিশনে নাম দিয়ে ছিপ দিয়ে লড়ি থেকে মাছ তুলে ফার্স্ট প্রাইজ জিতে নেবে। আর সেই বছরেই পুজোর উপহার হিসেবে ছোটকাকুর কাছ থেকে আদায় করলাম "টেনিদা সমগ্র।" 


"দাদা" শব্দটা অন্য ভাষায় কতটা প্রচলিত জানি না কিন্তু "দাদাগিরি"র পেটেন্ট বাঙালীরই। বেহালার মহারাজ কিংবা আলিমুদ্দিন স্ট্রীট ছাড়া দাদাগিরি কাকে মানায়? (পলিটিকালি কারেক্ট এবং জেন্ডার নিউট্রাল থাকার জন্য কালিঘাটের "দিদিগিরি" যোগ করা যাতে পারে।) তাই বিশ্ববিখ্যাত দাদা-রা যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ছেড়ে বাংলা সাহিত্যের পুণ্যভূমিতেই তাঁদের কীর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন তাতে আর আশ্চর্য কি??!! ঘনাদা-টেনিদা-ফেলুদা ত্রয়ীর মধ্যে প্রথম ও তৃতীয় জনের যাবতীয় বিশিষ্টতা স্বীকার করেও বলতে হয় বাংলা সাহিত্যে গল্পবলিয়ে বা গোয়েন্দার অভাব নেই। সেই দিক দিয়ে টেনিদার মত চরিত্র বাংলা সাহিত্যে প্রায় বিরল। "প্রায়" বললাম কারণ বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গণশার দল আর দীপঙ্কর বিশ্বাসের মেজদা অ্যান্ড কোং এর কথা মনে রাখতে হবে। 

না টেনিদা কোন সুপারম্যান নয়। জিনিয়াসও নয়। টেনিদা টেনিদা-ই। সে বছরের পর বছর একই ক্লাসে থেকে যায়। পরীক্ষা-ফরীক্ষাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলতে পারে, "কতকগুলো গাধা ছেলে গাদা গাদা বই মুখস্থ করে আর টকাটক পাশ করে যায়। পাশ না করতে পারাই সবচেয়ে শক্ত।" আবার সে-ই সম্রাট তেমুজিন আর হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার কাণ্ড, পকেটমার সম্রাট দশাননের জীবনচরিত কিংবা বার্মা ফ্রন্টে ক্যামোফ্লেজ করে জাপানিদের জব্দ করার গল্প শোনাতে পারে। সেসব গল্প না গুল্প সে তর্ক থাক কিন্তু এমন "গুল্প"ই বা কোন পড়ার বইয়ে মেলে? টেনিদা অন্ধকারে ছাদের পাঁচিলে বেড়ালের জ্বলন্ত চোখ দেখে ভির্মি খায়, নীলপাহাড়িতে কাটামুণ্ডুর নাচ দেখে খাটের তলায় লুকিয়ে পড়ে। সেই টেনিদা-ই গড়ের মাঠে গোরা পিটিয়ে সহবৎ শেখায়, মা নেংটিশ্বরীর তিনমণি মস্তান খগেন মাশ্চটক কে কুপোকাৎ করে ফেলে। হাড়কেপ্পন ভজগৌরাঙ্গবাবু, বিটকেল স্বভাবের ব্রহ্মবিকাশবাবু কিম্বা জাঁদরেল টিকিট চেকার রাইনোসোরাস জব্দ হয় টেনিদার হাতে। আবার প্যালাজ্বরে ভোগা, শিঙিমাছের ঝোল খাওয়া প্যালারাম সেই টেনিদাকেই টুপি পড়িয়ে মুড়ো বলে কাঁকড়ার দাঁড়া গছিয়ে দেয়! টেনিদা কাউকে কোনদিন খাইয়েছে এমন বদনাম কেউ দিতে পারবে না বলে গর্ব ছিল টেনিদার। নিত্য প্যালা, ক্যাবলা আর হাবুলের ঘাড় ভেঙে ঘুগনি আলুকাবলি, সিঙাড়া, মিষ্টি খাওয়াই টেনিদার ট্রেড মার্ক। সেই টেনিদাকেই বুদ্ধু বানিয়ে চারটে কাটলেট, দু প্লেট মাংস, এক প্লেট পোলাও আর এক প্লেট পুডিং খেয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ট্যাক্সিতে উধাও হয়ে যায় বেচারাম গড়গড়ি ওরফে হনোলুলুর মাকুদা। 

মুড়ি স্টেশনে কলার খোসায় আছাড় খাচ্ছে গজেশ্বর।
চারমূর্তি। শিল্পীঃ নরেন্দ্র দত্ত।
এই টেনিদাকে কেন প্রাণ দিয়ে ভালবাসে প্যালারাম, ঢাকাই হাবুল আর স্কলারশিপ পাওয়া ক্যাবলা তা যদি কেউ না বোঝেন তাহলে তিনি দাদাগিরির মানেই জানেন না। প্যালা-ক্যাবলা-হাবুল যেমন টেনিদা ছাড়া অনাথ, টেনিদাও তেমনি ভাইদের বাদ দিয়ে অসম্পূর্ণ। টেনিদা মানে আসলে পটলডাঙার চারমূর্তি। ক্যাবলা না থাকলে কে জানত যে কুরুবক একধরণের ফুল আর মেফিস্টোফিলিস মানে শয়তান? আর হাবুল বলেছিল বলেই তো জানলুম, বিড়ালের "মিঞাআও" ডাকের অর্থ হল "আইসো ইন্দুর মিঞা, তোমারে ধইর‍্যা চাবাইয়া খামু!" আর প্যালা? সে না থাকলে টেনিদার গল্প শোনাবে কে? ঝন্টিপাহাড়ির দুর্ধর্ষ জাপানি দস্যু কাগামাছির মুখোশই বা খুলবে কে?

আজকের ছোটরা, ইস্কুল থেকে যাদের বাড়িতে বলে দেওয়া হয়, "বাচ্ছার সঙ্গে একদম বাংলায় কথা বলবেন না", খেলা বলতে যারা ভিডিও গেম বোঝে, ইস্কুলের পর চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে আড্ডা না মেরে যারা ব্যাগ কাঁধে টিউশন পড়তে ছোটে, তাদের কাছে টেনিদার কোন আকর্ষণ থাকতে পারে কি? পরীক্ষার খাতায় সুন্দর করে নারকেল গাছের ছবি এঁকে আসার বিলাসিতা কি তাদের আছে? ওদের কথা শুনলে হাবুল সেন বলত, "ছাড়ান দাও, পোলাপান"। ক্যাবলা ভুরু কুঁচকিয়ে বলত "খামোশ"। অনেকদিন পশ্চিমে কাটিয়েছে বলে ওর মুখ থেকে মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রভাষা বেরিয়ে আসে। আর টেনিদা হয়ত এক চড় মেরে ওদের মুণ্ডু কাঠমাণ্ডুতে পাঠিয়ে দিত। আর তারপর প্যালার মাথায় গাঁট্টা মেরে বলত, কুরুবকের মত বকবক করিস না। যা ঐ বুড়োটার কাছ থেকে একটা ভালো দেখে আইসক্রিম নিয়ে আয়!   

(নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষকে মনে রেখে।)



Saturday, 27 May 2017

পাহাড়ের ডায়েরি (৫)

 শ্রী-তনু-র শেষকথা


সাড়ে নটা বেজে গেল কিন্তু সাগরভাই বা তার গাড়ির দেখা না পেয়ে সবারই কপালে চিন্তার ভাঁজ। এন জে পি তে ট্রেন বিকেল ৬টায়। এমনি তে ৭ ঘন্টার রাস্তা। কিন্তু অনি বলেছে যতটা পারা যায় সময় হাতে নিয়ে বেরোতে হবে। পাহাড়ি রাস্তা কখন কোথায় ধ্বস টস নেমে বন্ধ হয়ে যায় তার ঠিক থাকে না। আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম ওখরের সানবার্ড লজের সামনে। সিকিম ভ্রমণ সাঙ্গ করে এবার আমাদের ফেরার পালা। গতকাল পূর্বা ডিকি দিদির হাতে গড়া সিকিমি মোমো আর আড্ডা, ইয়ার্কি, নাচ, গান, নেপালি বাঁশির সুরে ক্যাম্প ফায়ারের মাধ্যমে জমে উঠেছিল সিকিম ট্রিপের অন্তিম রজনী। এত আনন্দের মাঝেই মনখারাপের মেঘ ঘনিয়ে আসছিল। কাল সকাল থেকেই আবার যে যার জীবনে ফিরে যাব। মনের মেঘ কাটাতে তাই বেশী করে করে পরের ট্রিপের প্ল্যান এর দিকে মনোনিবেশ করছিলাম। 


সাগরভাইয়ের দেখা পাওয়া গেল তখন ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পেমা সিরিং এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মালপত্তর নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। ঠাণ্ডা হাওয়া তখনও হাড় কাঁপাচ্ছিল। মনে মনে ভাবলাম আর কিছুক্ষণ, তারপরেই এই এক দমক ঠাণ্ডা হাওয়ার জন্য মনটা হু হু করে উঠবে। এঁকা বেঁকা রাস্তা দিয়ে গড়ি ছুটছিল। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে ধাপ কাটা উপত্যকা। কোথাও নদী আবার কোথাও বা গভীর খাদ। মনে হচ্ছিল কোন video যেন rewind করছি। ঠিক যেমন যেমন হচ্ছিল আসার দিন, আজও ঠিক একই রকম সবকিছু। সেই রাস্তা, সেই প্রকৃতি, সেই সাগরভাইয়ের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন জিনিস পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব, সুন্দরী মেয়েদের লিফট দেওয়া, গাড়ীর অডিও জ্যাকে আমাদের মোবাইল গুঁজে চিরপরিচিত গান। তফাৎ শুধু একটাই - যাওয়ার দিন মনে ছিল অসম্ভব একটা আনন্দ, curiosity, excitement আর এখন মনে পরিতৃপ্তির স্বাদ আর অল্প অল্প মনখারাপ।

২টোর সময় যখন শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের সামনে নামলাম তখন মনে হল যেন স্বর্গ থেকে নরকে নেমে এসেছি। গাড়ির জ্যাম আর প্রচণ্ড গরমে মনে হচ্ছিল শিলিগুড়ি নয়, কলকাতার এম জি রোডে দাঁড়িয়ে আছি! বব চটপট সবার জন্যে আখের রস এনে দিল। ছায়ায় দাঁড়িয়ে সেটা শেষ করার আগেই দেখি দলনেতা অনির্বান সামনের দিকে হাঁটা লাগিয়েছে। অনির্বানকে নেতার পদে পেতে হলে এটা মেনে নিতেই হবে। ও কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে কোন প্রশ্ন করা চলবে না। শুধু বাধ্য সৈনিকের মত অনুসরণ করতে হবে। তবে অনুসরণ করে পস্তেছি বলা যাবে না। এবার যেমন অনির্বানের পিছু পিছু গিয়ে দাঁড়ালাম "হোটেল নন্দিতা"র সামনে। হোটেল দেখেই খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠল। মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে উঠে অনির্বান বলল, "পান খাবি তো? চকোলেট পান?" একে পান, তার ওপর চকোলেট! এ লোভ কি সামলানো যায়! আবার সকলে লিডারকে অনুসরণ করলাম।

এতদিন লালরঙের ভিজে কাপড় দিয়ে পানপাতা চাপা দেওয়া গুমটি থেকে ৬ টাকার পান কিনে খেয়েছি। শিলিগুড়ির পান প্যালেসে এসে চমকে চ! কাঁচে ঘেরা শীততাপনিয়ন্ত্রিত দোকান। একদিকে নানা ধরণের তামাক আর পানীয় রয়েছে। চাইলে হুঁকোও খাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে বিভিন্ন রকম পান আর আইসক্রিমের সম্ভার। চটপট চকোলেট পান চলে এল সাদা প্লেটে করে। সাধারণ পানের দ্বিগুণ। ওপরে চকোলেটের কোটিং তার ওপর একটা লাল চেরী বসানো। বেশ কসরত করে কামড় দিলাম। চকোলেট, মিঠা পাতা পান আর হরেক রকম ড্রাই ফ্রুটসের অংশবিশেষ স্বাদকোরক ছুঁতেই অদ্ভুত একটা স্বর্গীয় শান্তি অনুভব করলাম। একে পান বললে ভুল হবে, একটা গোটা মিলের সমান! অনি যদি আগে বলত লাঞ্চ টা স্কিপ করে পানভোজন করেই কাটিয়ে দিতাম। এই চকোলেট পান দলনেতার তরফ থেকে আমাদের ট্রিট। পান খাইয়ে ট্রিট দেওয়া শুনে যাঁরা ভুরু কোঁচকাচ্ছেন তাঁদের জানিয়ে রাখা যাক আমরা যে চকোলেট পানগুলো খেলাম তার এক একটার দাম ১৩৫ টাকা। দেয়ালে টাঙানো রেট চার্ট দেখে আরো জানা গেল ঐ দোকানের সবচেয়ে দামী পানের দাম ৭০০ টাকা! 
 

উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস এনজেপি ঢুকলো আধঘন্টা দেরিতে। আমাদের সবারই সিট একসঙ্গে পড়েছিল। খালি পল্লবের একটু দূরে। এক্সচেঞ্জ করার লোক খুঁজে খুঁজে যখন হাল ছেড়ে দিলাম তখনই জানলার ধার থেকে একটা দাড়িওলা ছেলে গোঁফের তলা দিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ''চিন্তা করবেন না, আমি ঐ সিটটায় চলে যাব।" হাতে একটা বই নিয়ে বসে সে আমাদের কার্যকলাপ দেখছিল। কিন্তু তাকে আর ছাড়া গেল না। কারণ কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই সুজন বণিক আমাদের গ্রুপে একদম খাপে খাপ হয়ে মিশে গেল। ডিটেকটিভ গল্প থেকে ফুটবল, বেড়ানো থেকে খাওয়াদাওয়া আড্ডা আর হাসিঠাট্টায় তুফান তুলে অন্য সহযাত্রীদের যথেষ্ট বিরক্তি উৎপাদন করে যখন শোয়ার তোড়জোড় করলাম তখন আর খেয়াল করা হল না কে কার সিটে শুচ্ছে! 

আগামীকাল ভোরের আলো ফোটার আগেই যে যার গন্তব্যে নেমে পড়ব। কিছু কিছু সময় থাকে যেখানে আমরা আটকে যাই। এই ৫ দিন ঠিক তেমনি। অসাধারণ অবাক করা প্রকৃতি আর আমরা ৫ জন এমন বন্ধু যারা শুধু বন্ধু নয়, একটা পরিবারের অংশ। আড্ডা, গল্প, হাসি, ইয়ার্কি, অ্যাডভেঞ্চার - প্রকৃতির এক অদ্ভুত কম্বিনেশন। আজও ওখানেই আটকে আছি। রোজই স্বপ্ন দেখি কোন এক অজানা রাস্তায়, অপরিচিত পরিবেশে আমরা পাঁচজন খিল্লি করতে করতে হেঁটে চলেছি।

অপেক্ষা নেক্সট ট্রিপের।



ট্যুর প্ল্যানঃ

ট্রেনযাত্রা বাদ দিয়ে এই ট্রিপটা পাঁচদিনের। প্রথমদিন সকাল সকাল নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নামুন। শেয়ারে বা রিজার্ভ করে গাড়ি নিয়ে ১৩০ কিলোমিটার দূরে ওখরে বা আরো ১০ কিলোমিটার এগিয়ে হিলে তে চলুন। ৭-৮ ঘন্টা লাগবে। হিলে তে একটি মাত্র ট্রেকার্স হাট। থাকার ব্যবস্থা আরামদায়ক নয়। ওখরে তে অনেক ভালো লজ/ হোমস্টে পাবেন। কিন্তু ওখরে তে থাকলে পরদিন সকালে গাড়ি করে হিলে যেতে হবে। দ্বিতীয়দিন ২-৩ ঘন্টা ট্রেক করে ভার্সে যান। ভার্সেতে গুরস কুঞ্জ বা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লজে থাকুন। তৃতীয়দিন সকালে ট্রেক করে হিলেতে নামুন। সেখান থেকে ২ ঘন্টা গাড়িতে ভোরেং যান। ভোরেং থেকে আবার ঘন্টা দুয়েকের ট্রেক করে গোর্খে পৌছন। ইডেন লজে রাত্রিবাস করুন। চতুর্থদিন আবার ট্রেক করে ভোরেং আসুন। ভোরেং থেকে গাড়িতে ওখরে। বিকেলের দিকে ওখরে মনাস্ট্রি দেখে নিতে পারেন। পঞ্চমদিন সকালে গাড়ি করে নিউ জলপাইগুড়ি আসুন। 

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ

রডোডেনড্রনের বাহার দেখতে হলে মার্চ মাসের শেষদিক থেকে মে মাসের প্রথমদিকে মধ্যে যেতে হবে। ভোরেং থেকে থেকে গোর্খে ট্রেকটা একটু কঠিন হলেও হিলে-ভার্সে ট্রেকটা খুব বাচ্ছা বা বৃদ্ধ ছাড়া যেকোন সুস্থ মানুষ করতে পারবে।

দরকারি ফোন নম্বরঃ

1. Dipankar Dey (Majestic Himalayan Treks & Tours): 9749061941, 9733828481
2. Raj Nambang (Hilley Tour & Travel): 9733271137, 9593980310
3. Gopal Thapa (Pusai) (Barsey Home Stay): 9733412807, 9547219305
4. P. T. Sherpa (Sunbird Lodge Okhrey): 9647811674